بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৮৫ সূরাঃ আল-বুরুজ | Al-Buruj | سورة البروج - আয়াত সংখ্যাঃ ২২ - মাক্কী
৮৫:১ وَ السَّمَآءِ ذَاتِ الۡبُرُوۡجِ ۙ﴿۱﴾

কক্ষপথ বিশিষ্ট আসমানের কসম, আল-বায়ান

শপথ গ্রহ-নক্ষত্র শোভিত আকাশের তাইসিরুল

শপথ রাশিচক্র সমন্বিত আকাশের, মুজিবুর রহমান

১. শপথ বুরূজবিশিষ্ট(১) আসমানের,

(১) بُرُوجٌ শব্দটি بُرْجٌ এর বহুবচন। অর্থ বড় প্রাসাদ ও দুর্গ। অন্য আয়াতে আছে, (وَلَوْ كُنتُمْ فِي بُرُوجٍ مُّشَيَّدَةٍ) এখানে এই অর্থই বোঝানো হয়েছে। [কুরতুবী] অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে আলোচ্য আয়াতে بُرُوجٌ এর অর্থ বড় বড় গ্রহ-নক্ষত্র। কয়েকজন তাফসীরবিদ এ স্থলে অর্থ নিয়েছেন প্রাসাদ। অর্থাৎ সেসব গৃহ, যা আকাশে প্রহরী ও তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতাদের জন্যে নির্ধারিত। আবার কারও কারও মতে, এ অর্থ সুন্দর সৃষ্টি। অর্থাৎ সুন্দর সৃষ্টি আসমানের শপথ। তবে ইমাম ইবন জারীর আত-তাবারীর মত হচ্ছে, এখানে সূর্য ও চন্দ্রের অবস্থানস্থলসমূহ। আর তার সংখ্যা বারটি। সূর্য তার প্রতিটিতে একমাস চলে। আর চন্দ্র এর প্রতিটিতে দুইদিন ও একদিনের তিনভাগের এক অংশ সময় চলে। এতে করে চাঁদের আটাশটি অবস্থান হয়। তারপর সে দুদিন গোপন থাকে। এই বারটির প্রত্যেকটি একেকটি بُرْجٌ। চন্দ্র ও সূর্য আকাশের গতিতে গতিশীল হয়ে এসব بُرْجٌ এর মধ্যে অবতরণ করে। [ইবন কাসীর] তাই আয়াতের অর্থ হবে, সেই আসমানের শপথ, যাতে রয়েছে চাঁদ ও সূর্যের অবতরণস্থানসমূহ, অনুরূপ তাতে রয়েছে সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্রের অবতরণস্থলসমূহ, যেগুলো নিয়ম মেনে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চলছে। এ সুন্দর চলন ও সুন্দর নিয়মই আল্লাহর অপার শক্তি, রহমত, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করছে। [সা’দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

১। শপথ রাশিচক্র বিশিষ্ট আকাশের। [1]

[1] بُروج শব্দটি برج শব্দের বহুবচন। এর আসল অর্থ হল প্রকাশ। রাশিচক্র নক্ষত্রমালার প্রাসাদ ও অট্টালিকার মত। আর তা আকাশে প্রকাশ ও স্পষ্ট হওয়ার কারণে ‘বুরূজ’ বলা হয়। এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন সূরা ফুরকানের ৬১ নং আয়াতের টীকা। কেউ কেউ বলেন, ‘বুরূজ’ থেকে উদ্দেশ্য হল নক্ষত্রপুঞ্জ। অর্থাৎ, নক্ষত্রপুঞ্জবিশিষ্ট আকাশের কসম। আবার অনেকে বলেন, এর উদ্দেশ্য হল, আসমানের দরজাসমূহ অথবা চাঁদের কক্ষপথ। (ফাতহুল ক্বাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৮৫:২ وَ الۡیَوۡمِ الۡمَوۡعُوۡدِ ۙ﴿۲﴾

আর ওয়াদাকৃত দিনের কসম, আল-বায়ান

আর সেদিনের যার ও‘য়াদা করা হয়েছে, তাইসিরুল

এবং প্রতিশ্রুত দিনের, মুজিবুর রহমান

২. আর প্রতিশ্রুত দিনের,

-

তাফসীরে জাকারিয়া

২। শপথ প্রতিশ্রুত দিবসের। [1]

[1] সকলের মতেই এর উদ্দেশ্য হল কিয়ামত দিবস।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৮৫:৩ وَ شَاہِدٍ وَّ مَشۡہُوۡدٍ ؕ﴿۳﴾

আর কসম সাক্ষ্যদাতার এবং যার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেয়া হবে তার, আল-বায়ান

আর যে দেখে আর যা দেখা যায় তার শপথ তাইসিরুল

শপথ দ্রষ্টা ও দৃষ্টের। মুজিবুর রহমান

৩. এবং দ্রষ্টা ও দৃষ্টের(১)—

(১) হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (وَالْيَوْمِ الْمَوْعُودِ) বা প্রতিশ্রুত দিনের অর্থ কেয়ামতের দিন। আর مَشْهُود এর অর্থ আরাফার দিন এবং شاهد এর অর্থ শুক্রবার দিন। জুম'আর দিনের চেয়ে উত্তম কোন দিনে কোন সূর্য উদিত হয়নি এবং ডুবেওনি। সেদিন এমন একটি সময় আছে, কোন মুমিন বান্দা যখনই কোন কল্যাণের দো'আ করে তখনই তার দো'আ কবুল করা হয়। অথবা যদি কোন অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয় তখনই তাকে আল্লাহ তা থেকে আশ্রয় দেয়।” [তিরমিযী: ৩৩৩৯]

তাফসীরে জাকারিয়া

৩। শপথ দ্রষ্টার ও দৃষ্টের। [1]

[1] شاهد এবং مشهُود শব্দের ব্যাখ্যায় বহু মতভেদ রয়েছে। (شهد এর অর্থঃ দর্শন করা, সাক্ষ্য দেওয়া বা উপস্থিত হওয়া।) ইমাম শাওকানী হাদীস এবং আষারসমূহের ভিত্তিতে বলেন, شَاهد বলতে জুমআর দিনকে বোঝানো হয়েছে। এই দিনে যে ব্যক্তি যা আমল করবে তার জন্য কিয়ামতের দিন ঐ আমলসমূহ সাক্ষী দেবে। আর مشهود বলে আরাফার (৯ যিলহজ্জের) দিনকে বোঝান হয়েছে যে দিনে লোকেরা হজ্জের উদ্দেশ্যে জমায়েত হয়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৮৫:৪ قُتِلَ اَصۡحٰبُ الۡاُخۡدُوۡدِ ۙ﴿۴﴾

ধ্বংস হয়েছে গর্তের অধিপতিরা, আল-বায়ান

ধ্বংস হয়েছে গর্ত ওয়ালারা তাইসিরুল

ধ্বংস হয়েছিল কুন্ডের অধিপতিরা – মুজিবুর রহমান

৪. অভিশপ্ত হয়েছিল(১) কুণ্ডের অধিপতিরা—(২)

(১) এখানে আল্লাহ্ তা'আলা চারটি বস্তুর শপথ করার পর মূল কথা বর্ণনা করেছেন। (এক) বুরুজবিশিষ্ট আকাশের; (দুই) কেয়ামত দিবসের; (তিন) আরাফার দিনের এবং (চার) শুক্রবারের। এসব শপথের সম্পর্ক এই যে, এগুলো আল্লাহ্ তা'আলার পরিপূর্ণ শক্তি, কেয়ামতের হিসাব-নিকাশ এবং শাস্তি ও প্রতিদানের দলীল। শুক্রবার ও আরাফার দিন মুসলিমদের জন্যে আখেরাতের পুঁজি সংগ্রহের পবিত্ৰ দিন।


(২) যারা বড় বড় গর্তের মধ্যে আগুন জ্বলিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল এবং তাদের জ্বলে পুড়ে মরার বীভৎস দৃশ্য নিজেদের চোখে দেখেছিল তাদেরকে এখানে গর্তওয়ালা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, তাদের ওপর আল্লাহর লা'নত পড়েছিল এবং তারা আল্লাহর আযাবের অধিকারী হয়েছিল। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] এর আরেক অর্থ ধ্বংস হয়েছিল। [সা'দী]

গর্তে আগুন জ্বলিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করার ঘটনা সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। সুহাইব রুমী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। এক বাদশার কাছে একজন যাদুকর ছিল। বৃদ্ধ বয়সে সে বাদশাহকে বললো, একটি ছেলেকে আমার কাছে নিযুক্ত করো, সে আমার কাছ থেকে এ জাদু শিখে নেবে। বাদশাহ জাদু শেখার জন্য জাদুকরের কাছে একটি ছেলেকে নিযুক্ত করলো। কিন্তু সেই ছেলেটি জাদুকরের কাছে আসা যাওয়ার পথে একজন রাহেবের (যিনি সম্ভবত ঈসা আলাইহিস সালামের দ্বীনের অনুসারী একজন সাধক ছিলেন) সাক্ষাত গুণে সে অলৌকিক শক্তির অধিকারীও হয়ে গেলো। সে অন্ধদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে এবং কুষ্ঠরোগ নিরাময় করতে লাগলো। ছেলেটি তাওহীদের প্রতি ঈমান এনেছে, একথা জানতে পেরে বাদশাহ প্ৰথমে রাহেবকে হত্যা করলো তারপর ছেলেটিকে হত্যা করতে চাইলো।

কিন্তু কোন অস্ত্ৰ দিয়েই এবং কোনভাবেই তাকে হত্যা করতে পারলো না। শেষে ছেলেটি বললো, যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে চাও তাহলে প্রকাশ্য জনসমাবেশে “বিসমি রাব্বিল গুলাম” (অর্থাৎ এই ছেলেটির রবের নামে) বাক্য উচ্চারণ করে আমাকে তীর মারো, তাতেই আমি মারা যাবো। বাদশাহ তাই করলো। ফলে ছেলেটি মারা গেলো। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে লোকেরা চিৎকার করে উঠলো, আমরা এই ছেলেটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। বাদশাহর সভাসদরা তাকে বললো, এখন তো তাই হয়ে গেলো যা থেকে আপনি বাঁচতে চাচ্ছিলেন। লোকেরা আপনার ধর্ম ত্যাগ করে এ ছেলেটির ধর্মগ্রহণ করেছে। এ অবস্থা দেখে বাদশাহ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলো। সে রাস্তার পাশে গর্ত খনন করালো। তাতে আগুন জ্বালালো। যারা ঈমান ত্যাগ করতে রাজী হলো না তাদের সবাইকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করলো। [মুসলিম: ৩০০৫ তিরমিযী: ৩৩৪০]

তাফসীরে জাকারিয়া

৪। ধ্বংস হয়েছে কুন্ডের অধিপতিরা। [1]

[1] অর্থাৎ, যারা খন্দক (কুন্ড) খনন করে আল্লাহর অনুগত বান্দাদেরকে ধ্বংস ও হত্যা করেছিল তাদের জন্যও ধ্বংস ও সর্বনাশ রয়েছে। قُتِلَ শব্দটি এখানে لُعِنَ এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৮৫:৫ النَّارِ ذَاتِ الۡوَقُوۡدِ ۙ﴿۵﴾

(যাতে ছিল) ইন্ধনপূর্ণ আগুন। আল-বায়ান

(যে গর্তে) দাউ দাউ করে জ্বলা ইন্ধনের আগুন ছিল, তাইসিরুল

ইন্ধনপূর্ণ যে কুন্ডে ছিল অগ্নি। মুজিবুর রহমান

৫. যে কুণ্ডে ছিল ইন্ধনপূর্ণ আগুন,

-

তাফসীরে জাকারিয়া

৫। (যে কুন্ডে ছিল) ইন্ধনপূর্ণ অগ্নি।[1]

[1] النَّار শব্দটি الأخدُود থেকে বদলে ইশতিমাল। ذات الوقود শব্দটি النار শব্দের সিফাত (বিশেষণ)। অর্থাৎ, খন্দক কি ধরনের ছিল? ইন্ধনপূর্ণ অগ্নি। যা ঈমানদারদেরকে নিক্ষেপ করার জন্য প্রজ্বলিত করা হয়েছিল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৮৫:৬ اِذۡ ہُمۡ عَلَیۡہَا قُعُوۡدٌ ۙ﴿۶﴾

যখন তারা তার কিনারায় উপবিষ্ট ছিল। আল-বায়ান

যখন তারা গর্তের কিনারায় বসে ছিল তাইসিরুল

যখন তারা এর পাশে উপবিষ্ট ছিল; মুজিবুর রহমান

৬. যখন তারা এর পাশে উপবিষ্ট ছিল;

-

তাফসীরে জাকারিয়া

৬। যখন তারা তার কিনারায় বসেছিল। [1]

[1] কাফের বাদশাহ অথবা তাদের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীরা আগুনের কিনারায় বসে ঈমানদার পোড়ার তামাশা দেখছিল। যেমন, পরবর্তী আয়াতে তা বর্ণিত হয়েছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৮৫:৭ وَّ ہُمۡ عَلٰی مَا یَفۡعَلُوۡنَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ شُہُوۡدٌ ؕ﴿۷﴾

আর তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তার প্রত্যক্ষদর্শী। আল-বায়ান

আর তারা মু’মিনদের সাথে যা করছিল তা দেখছিল তাইসিরুল

এবং তারা মু’মিনদের সাথে যা করেছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল। মুজিবুর রহমান

৭. এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা প্ৰত্যক্ষ করছিল।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

৭। আর তারা মুমিনদের সাথে যা করেছিল, নিজেরাই তার সাক্ষী।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৮৫:৮ وَ مَا نَقَمُوۡا مِنۡہُمۡ اِلَّاۤ اَنۡ یُّؤۡمِنُوۡا بِاللّٰہِ الۡعَزِیۡزِ الۡحَمِیۡدِ ۙ﴿۸﴾

আর তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধুমাত্র এ কারণে যে, তারা মহাপরাক্রমশালী প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। আল-বায়ান

তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল একমাত্র এই কারণে যে, তারা মহাপরাক্রান্ত প্রসংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। তাইসিরুল

তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু এ কারণে যে, তারা সেই মহিমাময় পরাক্রান্ত প্রশংসাভাজন আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। মুজিবুর রহমান

৮. আর তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু এ কারণে যে, তারা ঈমান এনেছিল পরাক্রমশালী ও প্রশংসার যোগ্য আল্লাহর উপর—

-

তাফসীরে জাকারিয়া

৮। তারা তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিল শুধু এই কারণে যে, তারা মহাপরাক্রমশালী প্রশংসাভাজন আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।[1]

[1] অর্থাৎ, ঐ সব লোকেদের অপরাধ যাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল এই ছিল যে, তারা মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিল। এ ব্যাপারে বিস্তারিত ঘটনা, যা সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপঃ-

আসহাবুল উখদূদের সংক্ষিপ্ত কাহিনীঃ

অতীতকালে এক বাদশার একটি যাদুকর ও গণক ছিল। যখন সে গণক বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হল, তখন সে বাদশাহকে বলল, আমাকে একটি বুদ্ধিমান বালক দিন, যাকে আমি এই বিদ্যা শিক্ষা দেব। সুতরাং বাদশাহ সেই রকম বুদ্ধিমান বালক খোঁজ করে তাকে তার কাছে সমর্পণ করলেন। ঐ বালকের পথে এক পাদরিরও ঘর ছিল। বালকটি পথে আসা-যাওয়ার সময় সেই পাদরির নিকট গিয়ে বসত এবং তার কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করত, যা তাকে ভালও লাগত। এ ভাবেই তার আসা যাওয়া অব্যাহত থাকে। একদা এই বালকটির যাওয়ার পথে এক বৃহদাকার জন্তু (বাঘ অথবা সাপ) বসেছিল; যে মানুষের আসা-যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল। বালকটি চিন্তা করল, আজকে আমি পরীক্ষা করব যে, যাদুকর সত্য, না পাদরি। সে একটি পাথরের টুকরা কুড়িয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ! যদি পাদরির আমল তোমার নিকট যাদুকরের আমল থেকে উত্তম এবং পছন্দনীয় হয়, তাহলে এই জন্তুকে মেরে ফেল; যাতে মানুষের আসা-যাওয়ার পথ চালু হয়ে যায়।’ এই বলে বালকটি পাথর ছুড়লে জন্তুটি মারা গেল। এবার বালকটি পাদরির নিকট গিয়ে সব কথা বিস্তারিত বলল। পাদরি বললেন, ‘হে বৎস! এবার দেখছি তুমি পূর্ণ দক্ষতায় পৌঁছে গেছ। এবার তোমার পরীক্ষা শুরু হতে চলেছে। কিন্তু এই পরীক্ষা অবস্থায় আমার নাম তুমি প্রকাশ করবে না।’ এই বালকটি জন্মান্ধত্ব, ধবল প্রভৃতি রোগের চিকিৎসাও করত; তবে তা আল্লাহর উপর বিশ্বাসের উপর শর্ত রেখেই করত।

এই শর্তানুযায়ী বাদশার এক সহচরের অন্ধ চক্ষুকে আল্লাহর কাছে দু’আ করে ভাল করে দিল। বালকটি বলত যে, ‘যদি আপনি আল্লাহর উপর ঈমান আনেন, তাহলে আমি তাঁর নিকট দু’আ করব; তিনি আরোগ্য দান করবেন।’ সুতরাং সে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি রোগীকে আরোগ্য দান করতেন। এই খবর বাদশাহর নিকট পৌঁছলে, তিনি বড় উদ্বিগ্ন হলেন। কিছু সংখ্যক ঈমানদারকে তিনি হত্যা করে ফেললেন। আর এই বালকটির ব্যাপারে তিনি কয়েকটি লোককে ডেকে বললেন যে, ‘এই বালকটিকে উঁচু পাহাড়ের উপর নিয়ে গিয়ে নিচে ফেলে দাও।’ বালকটি আল্লাহর কাছে দু’আ করলে পাহাড় কাঁপতে লাগল; যার কারণে সে ছাড়া সকলেই পড়ে মারা গেল। বাদশাহ তখন বালকটিকে অন্য কিছু লোকের কাছে সমর্পণ করে বললেন, ‘একে একটি নৌকায় চড়িয়ে সমুদ্রের মধ্যস্থলে নিয়ে গিয়ে তাতে নিক্ষেপ কর।’ সেখানেও বালকটির দু’আর কারণে নৌকাটি উল্টে গেল।
যার ফলে সকলে পানিতে ডুবে মারা গেল। কিন্তু বালকটি বেঁচে গেল। এবার বালকটি বাদশাকে বলল, ‘যদি আপনি আমাকে হত্যাই করতে চান, তাহলে এর সঠিক পদ্ধতি হল এই যে, একটি খোলা ময়দানে লোকদেরকে জমায়েত করুন, আর ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গুলাম’ (অর্থাৎ, বালকের প্রভুর নামে আরম্ভ করছি) বলে আমার প্রতি তীর নিক্ষেপ করুন; ‎ দেখবেন আমি মৃত্যু বরণ করব।’ বাদশাহ তাই করলেন। যার কারণে বালকটি মৃত্যু বরণ করল। সেই ঘটনাস্থলেই লোকেরা সোচ্চার হয়ে বলে উঠল যে, ‘আমরা এই বালকটির রবের (প্রভুর) উপর ঈমান আনলাম।’ বাদশাহ আরো অধিক উদ্বিগ্ন হলেন। অতএব তিনি তাদের জন্য গর্ত খনন করিয়ে তাতে আগুন জ্বালাতে আদেশ করলেন। অতঃপর হুকুম দিলেন যে, ‘যে ব্যক্তি ঈমান হতে ফিরে না আসবে, তাকে এই অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ কর।’ এইভাবে ঈমানদার ব্যক্তিরা আসতে থাকল এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে থাকল। পরিশেষে একটি মহিলার পালা এল, যার সঙ্গে তার বাচ্চাও ছিল। সে একটু পশ্চাদপদ হল। কিন্তু বাচ্চাটি বলে উঠল, ‘আম্মাজান! ধৈর্য ধরুন। আপনি সত্যের উপরে আছেন।’ (সুতরাং সেও আগুনে শহীদ হয়ে গেল।) (সহীহ মুসলিম যুহদ অধ্যায় আসহাবে উখদূদ পরিচ্ছেদ)

ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) আরো অন্যান্য ঘটনা নকল করেছেন যা এ ঘটনা হতে ভিন্ন। তিনি বলেছেন, হতে পারে এইরূপ অন্যান্য ঘটনাবলী নানান স্থানে ঘটেছে। (ইবনে কাসীর দেখুন)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৮৫:৯ الَّذِیۡ لَہٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ شَہِیۡدٌ ؕ﴿۹﴾

আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব যার। আর আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী। আল-বায়ান

আসমান ও যমীনের রাজ্বত্ব যাঁর, আর সেই আল্লাহ সব কিছুর প্রত্যক্ষদর্শী। তাইসিরুল

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব যাঁর, আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে দ্রষ্টা। মুজিবুর রহমান

৯. আসমানসমূহ ও যমীনের সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর; আর আল্লাহ্ সবকিছুর প্ৰত্যক্ষদর্শী।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

৯। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব যাঁর। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ের সম্যক দ্রষ্টা।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৮৫:১০ اِنَّ الَّذِیۡنَ فَتَنُوا الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتِ ثُمَّ لَمۡ یَتُوۡبُوۡا فَلَہُمۡ عَذَابُ جَہَنَّمَ وَ لَہُمۡ عَذَابُ الۡحَرِیۡقِ ﴿ؕ۱۰﴾

নিশ্চয় যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে আযাব দেয়, তারপর তাওবা করে না, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব। আর তাদের জন্য রয়েছে আগুনে দগ্ধ হওয়ার আযাব। আল-বায়ান

যারা মু’মিন পুরুষ ও নারীদের প্রতি যুলম পীড়ন চালায় অতঃপর তাওবাহ করে না, তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি, আর আছে আগুনে দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা। তাইসিরুল

যারা বিশ্বাসী নর নারীকে বিপদাপন্ন করেছে এবং পরে তাওবাহ করেনি, তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি ও দহন যন্ত্রণা (নির্ধারিত) রয়েছে। মুজিবুর রহমান

১০. নিশ্চয় যারা মুমিন নরনারীকে বিপদাপন্ন করেছে(১) তারপর তাওবা করেনি(২) তাদের জন্য আছে জাহান্নামের যন্ত্রণা।(৩)

(১) فَتَنُوا শব্দের এক অর্থ হচ্ছে, أحرقوا বা জ্বালিয়েছিল। অপর অর্থ পরীক্ষা করা। বিপদে ফেলা। [ফাতহুল কাদীর]


(২) কাফেরদের জাহান্নামের আযাব ও দহন যন্ত্রণার খবর দেয়ার সাথে সাথে কুরআন বলছে যে, এই আযাব তাদের ওপর পতিত হবে, যারা এই দুষ্কর্মের কারণে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেনি। এতে তাদেরকে তাওবার দাওয়াত দেয়া হয়েছে। হাসান বসরী বলেনঃ বাস্তবিকই আল্লাহর অনুগ্রহ ও কৃপার কোন তুলনা নেই। তারা তো আল্লাহর নেক বান্দাদেরকে জীবিত দগ্ধ করে তামাশা দেখছে, আল্লাহ তা’আলা এরপরও তাদেরকে তওবা ও মাগফিরাতের দাওয়াত দিচ্ছেন। [ইবনুল কাইয়্যেম, বাদায়ে’উস তাফসীর; ইবন কাসীর]


(৩) এখানে অত্যাচারী কাফেরদের শাস্তি বর্ণিত হয়েছে, যারা মুমিনদেরকে কেবল ঈমানের কারণে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিল। শাস্তি প্রসঙ্গে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে— (এক) তাদের জন্যে আখেরাতে জাহান্নামের আযাব রয়েছে, (দুই) তাদের জন্যে দহন যন্ত্রণা রয়েছে। এখানে দ্বিতীয়টি প্রথমটিরই বর্ণনা ও তাকীদ হতে পারে। অর্থাৎ জাহান্নামে গিয়ে তারা চিরকাল দহন যন্ত্রণা ভোগ করবে। এটাও সম্ভবপর যে, দ্বিতীয় বাক্যে দুনিয়ার শাস্তি বর্ণিত হয়েছে। প্রখ্যাত আলেম রবী ইবনে আনাস বলেন, মুমিনদেরকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করার পর অগ্নি স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা তাদের রূহ কবজ করে নেন। এভাবে তিনি তাদেরকে দহন যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন। ফলে তাদের মৃতদেহই কেবল অগ্নিতে দগ্ধ হয়। অতঃপর এই অগ্নি আরও বেশি প্রজুলিত হয়ে তার লেলিহান শিখা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে যারা মুসলিমদের অগ্নি দগ্ধ হওয়ার তামাশা দেখছিল, তারাও এই আগুনে পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়। [ফাতহুল কাদীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

১০। নিশ্চয় যারা বিশ্বাসী নর-নারীকে বিপদাপন্ন করেছে এবং পরে তাওবা করেনি, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি ও দহন যন্ত্রণা।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ২২ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 পরের পাতা »