শির্ক কী ও কেন? প্রথম পরিচ্ছেদ ড. মুহাম্মদ মুয্‌যাম্মিল আলী
দ্বিতীয় প্রকার : পরিচালনা বা ব্যবহারগত শির্ক

আমরা সকলেই এ কথা স্বীকার করি যে, আল্লাহ আমাদের রব, কিন্তু কোন্ কোন্ বৈশিষ্ট্যগুণে তিনি আমাদের রব, সে সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা নেই। আল্লাহ তা‘আলা যে সব বৈশিষ্ট্যগুণে আমাদের রব, সে সব বৈশিষ্ট্যের মধ্যকার কতিপয়ের বিবরণ আমরা ইতোপূর্বে আল্লাহ তা‘আলার রুবূবিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা প্রসঙ্গে দিয়ে এসেছি। সুতরাং এখানে পুনরায় সে সবের বর্ণনা প্রদানের প্রয়োজন নেই। এখানে যে বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য তা হলো : একজন মানুষ যদি আল্লাহ তা‘আলাকে তাঁর রুবূবিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যের আলোকে তাঁকে তার রব বলে স্বীকার করে, তাহলে তাকে বুঝতে হবে যে, এ স্বীকৃতির অর্থ হচ্ছে- আমি মহান আল্লাহকে এ জগতের সব কিছুর রব তথা সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকার করার পাশাপাশি এ স্বীকৃতিও প্রদান করছি যে, এ জগত ও তন্মধ্যকার সব কিছুর একচ্ছত্র মালিক ও পরিচালনাকারী এককভাবে তিনিই; কেননা, তিনি তাঁর রুবূবিয়্যাতের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন :

﴿ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ إِلَى ٱلۡأَرۡضِ﴾ [السجدة: ٥]

‘‘তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সব বিষয় পরিচালনা করেন।’’[1] মানুষেরা যে সব মূর্তির নিকটে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য আবেদন করে, এদের কেউই তাঁর এ জগতের অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক বা শরীক বা তা পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর সাহায্যকারী, এমনকি সুপারিশকারীও নয় বলে তিনি কুরআনুল কারীমের সূরা ‘সাবা’ এর ২২ ও ২৩ আয়াতে ঘোষণা দিয়েছেন। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে মানুষ ব্যতীত অন্যান্য যত সৃষ্টি রয়েছে, তিনি তাদেরকে যেমন সুষ্ঠু ও নিখুঁত বিধানের দ্বারা পরিচালনা করে থাকেন, তেমনি মানব জাতিকেও তিনি তাঁর সুষ্ঠু বিধানের দ্বারা এ পৃথিবীতে পরিচালনা করে থাকেন। এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য তিনি তাদেরকে একদিকে পালনের জন্য দিয়েছেন সর্বশেষ অহীর বিধান আল-কুরআন ও তাঁর রাসূলের হাদীস, অপর দিকে তাদের ভাগ্যের যাবতীয় কল্যাণ ও অকল্যাণের চাবিকাঠি রেখেছেন তাঁর নিজের হাতে। আল্লাহর রুবূবিয়্যাতের বিশ্বাস যথার্থ হওয়া এবং রুবূবিয়্যাতের পরিচালনাগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে শির্ক থেকে বাঁচতে হলে তাদেরকে অবশ্যই জীবনের সকল ক্ষেত্রে অহীর বিধান মানতে হবে। এর পাশাপাশি তাদের ভাগ্যের যে কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর কোনো সৃষ্টিকে উপকারী বা অপকারী ধারণা না করে একমাত্র আল্লাহকেই তাদের যাবতীয় উপকার ও অপকারের মালিক ও পরিচালক বলে বিশ্বাস করতে হবে। অহীর বিধানের ব্যাপারে তাদের করণীয় হবে :

১ তাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কেবল কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত বিধানের অনুসরণ ও অনুকরণ করা। এ সব ক্ষেত্রে কুরআন ও সহীহ হাদীসের বিধান থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের বা অন্য কারো রচিত কোনো বিধান মেনে চলা থেকে বিরত থাকবে।

২. তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পরিচালনা করবে।

৩. পশ্চিমা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির রাজনীতির সংস্কার সাধন করে ইসলামের শূরাভিত্তিক রাজনীতির দ্বারা দেশ পরিচালনা করবে।

৪. পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পরিবর্তে ইসলামী অর্থনীতির প্রচলন করবে।

৫. কোনো বিষয়ে আইন রচনার প্রয়োজন হলে সংসদে বসে প্রারম্ভে সে বিষয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসে কী রয়েছে, তা খতিয়ে দেখবে। তাতে সরাসরি কোনো বিধান পাওয়া না গেলে নিজেরা সে বিষয়ে ইজতেহাদ করবে। কোনো দেশে প্রচলিত কোনো বিধান গ্রহণ করলে তা শরী‘আতের উদ্দেশ্যের (مقاصد الشريعة) সাথে সাংঘর্ষিক কি না, তা খতিয়ে দেখবে।

৬. কোনো বিষয়ে ধর্মীয় বিষেশজ্ঞদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দিলে সে বিষয়ের ফয়সালার জন্য কারো ব্যক্তিগত মত বা কোনো মাযহাবকে প্রাধান্য না দিয়ে যার বক্তব্য কুরআন ও সহীহ হাদীসের অধিকতর নিকটে হবে, তার মতকেই অনুসরণ করবে।

৭. আল্লাহর অবাধ্যতায় কারো আদেশ বা নিষেধ পালন করা থেকে বিরত থাকবে।

মানুষেরা যদি উপর্যুক্ত এ কর্তব্যসমূহ পালন করে, তাহলে এতে তাদের উপর আল্লাহর রুবূবিয়্যাত প্রতিষ্ঠিত হবে; অন্যথায় যে সব ক্ষেত্রে তারা শরী‘আতের বিধান লঙ্ঘন করে নিজের রচিত বা অন্যের রচিত বিধান পালন করবে, সে সব ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর পরিচালনাগত বৈশিষ্ট্যের সাথে নিজেদেরকে শরীক করে নেবে এবং পরস্পরকে রবের আসনে বসিয়ে দেবে। ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানরা এ জাতীয় কর্ম করেছিল বলেই কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্‌ তাদের সামালোচনা করে বলেন :

﴿ ٱتَّخَذُوٓاْ أَحۡبَارَهُمۡ وَرُهۡبَٰنَهُمۡ أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِ ﴾ [التوبة: ٣١]

“ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানরা তাদের অসংখ্য ধর্মযাজকদেরকে আল্লাহর পরিবর্তে রব বানিয়ে নিয়েছিল।’’[2]

এ ছাড়াও অহীর বিধান বাদ দিয়ে ধর্মযাজকদের রচিত বিধান অন্ধ ভাবে পালন করে পরস্পরকে রব না বানানো প্রসঙ্গে আহলে কিতাবদের উপদেশ প্রদান করতে যেয়ে মহান আল্লাহ বলেন :

﴿وَلَا يَتَّخِذَ بَعۡضُنَا بَعۡضًا أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِۚ﴾ [ال عمران: ٦٤]

“আর আমরা পরস্পরকে আল্লাহর পরিবর্তে অসংখ্য রব বানিয়ে না নেই।’’[3] মুসলিমরা যদি অনুসরণ ও অনুকরণের ক্ষেত্রে ইয়াহূদীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তা হলে তাদের অবস্থাও ওদের মতই হবে।

>
[1]. আল-কুরআন, সূরা আস-সাজদাহ : ৫।

[2]. আল-কুরআন, সূরা আত্-তাওবাহ : ৩১।

[3]. আল-কুরআন, সূরা আলে ইমরান : ৬৪।