শরহুল আকীদাহ আল-ওয়াসেতীয়া ডঃ সালেহ ফাওযান [অনুবাদ: শাইখ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী] ১১২ টি
শরহুল আকীদাহ আল-ওয়াসেতীয়া ডঃ সালেহ ফাওযান [অনুবাদ: শাইখ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী] ১১২ টি

الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين أما بعد:

দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ অর্জনের জন্য সর্বপ্রথম সঠিক ইসলামী আকীদাহ গ্রহণ অপরিহার্য। এ জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মক্কী জীবনের সম্পূর্ণ সময় মুশরিকদের বাতিল আকীদাহ বর্জন করে নির্ভেজাল তাওহীদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন এবং এ পথে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। কারণ ইসলামে সঠিক আকীদাবিহীন আমলের কোন মূল্য নেই।

আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের উপরই দুনিয়া ও পরকালীন জীবনে সৌভাগ্য অর্জন নির্ভর করে। সুতরাং আল্লাহ্ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জনের প্রতিই মানুষের প্রয়োজন সর্বাধিক। বান্দা যতক্ষণ আল্লাহর প্রভুত্ব, উলুহীয়াত, তাঁর অতি সুন্দর নামসমূহ এবং তাঁর সুউচ্চ গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন না করবে, ততক্ষণ সে প্রকৃত শান্তি অর্জন করতে সক্ষম হবেনা। মানুষের মনে স্রষ্টার অস্তিত্ব, তাঁর পবিত্র সত্তা ও গুণাবলী, তাঁর সৃষ্টি ও কর্মসমূহ, সৃষ্টির সূচনা, উহার পরিসমাপ্তি, সৃষ্টিজগতের সকল সৃষ্টি, তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক, তাকদীর এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবন ও তাতে সংঘটিতব্য বিষয়াদি সম্পর্কে যেসব সন্দেহ ও প্রশ্ন জাগ্রত হয়, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইসলামী আকীদাহই কেবল সেসব প্রশ্ন ও সন্দেহের জবাব দিতে সক্ষম। পৃথিবীতে মুসলিমদের বিজয়, সাফল্য, প্রতিপত্তি এবং প্রতিষ্ঠা লাভের মূলে ছিল তাদের নির্ভেজাল ও পরিশুদ্ধ আকীদাহ বিশ্বাস। যতদিন মুসলিমদের আকীদাহ বিশ্বাস সঠিক ও সুদৃঢ় ছিল, ততদিন তারা সমগ্র পৃথিবীর শাসক ছিল।

এ জন্যই কুরআন মানুষের আকীদাহ পরিশুদ্ধ করার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। নবী-রাসূলদের দাওয়াতের মূল বিষয়ই ছিল আকীদাহর সংশোধন। তারা সর্বপ্রথম যে বিষয়ের প্রতি আহবান জানাতেন, তা হলো এককভাবে আল্লাহর এবাদত করা এবং অন্যসব বস্ত্তর এবাদত বর্জন করা। মক্কাতে একটানা তের বছর অবস্থান করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকীদাহ সংশোধনের কাজে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

কুরআন ও সুন্নাহ্য় আল্লাহর সত্তা, তাঁর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী, ফেরেশতা, আখেরাত ইত্যাদি গায়েবী বিষয়কে অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। ইসলামের গৌরবময় যুগে মুসলিমদের তা বুঝতে কোন অসুবিধা হয়নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তারা বিষয়গুলো শুনে তা সহজভাবেই বুঝে নিয়েছেন এবং বিশ্বাস করেছেন। আর এ বিষয়গুলো বোধশক্তি ও যুক্তির মাধ্যমে বুঝার কোন সুযোগ নেই। অহীর উপর নির্ভর করা ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই। সেই সাথে কুরআন ও হাদীছে আলোচিত গায়েবী বিষয়গুলো মানুষের বিবেক-বুদ্ধির সাথে সাংঘর্ষিকও নয়।

কিন্তু পরবর্তীতে যখন গ্রীক দর্শনের কিতাবাদি আরবীতে অনুবাদ করা হলো, তখন থেকেই ইসলামী জ্ঞান ভান্ডারের উপর গ্রীক দর্শনের প্রভাব পড়তে থাকে। আববাসী খেলাফতকালে সরকারীভাবে এ কাজে উৎসাহ প্রদান করা হয়। ফলে মুসলিমদের লাইব্রেরীগুলো গ্রীক দর্শনের কিতাবে ভরপুর হয়ে যায়। মুসলিম বিদ্বানগণ গ্রীক দর্শনের দিকে ঝুকে পড়ে। ইসলামী আকীদাহর উপরও গ্রীক দর্শনের প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী, তাঁর কার্যাবলী, সৃষ্টির সূচনা ও পরিসমাপ্তি, পরিণাম, কিয়ামত, হাশর-নাশর, মানুষের আমলের ফলাফল এবং এ ধরণের অন্যান্য গায়েবী বিষয়গুলো জানার জন্য কুরআন-সুন্নাহর পথ ছাড়া আর কোন পথ নেই। চিন্তা-ভাবনা, আন্দাজ-অনুমান করে এ বিষয়গুলো জানা অসম্ভব। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর ধারে কাছে পৌঁছানো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে মানুষের কোন অভিজ্ঞতাও নেই। এসব বিষয় চোখেও দেখা যায়না। কুরআন সুস্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে, ﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾ ‘‘তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা’’। (সূরা শুরা: ১১) কাজেই এ বিষয়ে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের উপর নির্ভর করাই সঠিক আকীদাহর উপর টিকে থাকার একমাত্র মাধ্যম।

কিন্তু গ্রীক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলিম দার্শনিকরা কুরআন ও সুন্নাহর সহজ সরল উক্তিগুলো বাদ দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর গুণাবলী, আখেরাত এবং অন্যান্য গায়েবী বিষয়গুলোর দার্শনিক ও বুদ্ধিভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান শুরু করে। তাদের জবাব দেয়ার জন্য আরেক শ্রেণীর মুসলিম আলেম দাঁড়িয়ে যায়। এরা হলো মুসলিম কালামশাস্ত্রবিদ। তারাও দার্শনিকদের জবাবে বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করতে থাকেন। কিন্তু তাদের উপস্থাপিত যুক্তি-তর্ক দার্শনিকদের জবাব দিতে বহুলাংশে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের যুক্তিগুলো ছিল তুলনামূলক দুর্বল। এগুলো সংশয় দূর করার বদলে নতুন নতুন সংশয় ও সমস্যার সৃষ্টি করেছে এবং এমনসব জটিলতা, দুর্বোধ্যতার সৃষ্টি করেছে, যার জবাব স্বয়ং কালামশাস্ত্রবিদগণ খুজেঁ না পেয়ে নিজেরাই সংশয়ে পড়েছে।

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী শেষ বয়সে উপনীত হয়ে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, তিনি কালামী পদ্ধতি ও দার্শনিক উপস্থাপন প্রক্রিয়ার উপর অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছেন। শেষ জীবনে তিনি এ সিদ্বান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এর ফলে রোগীর রোগ নিরাময় হওয়ার চেয়ে আরো বৃদ্ধি পায় এবং তৃষ্ণার্তের পিপাসা মোটেই নিবারণ হয়না। তিনি বলেন, কুরআন-সুন্নাহর পদ্ধতিই আমি নিকটতর পেয়েছি।

আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর সত্তা ও গুনাবলী সম্পর্কে কালাম শাস্ত্রবিদ ও মুসলিম দার্শনিকগণ বুদ্ধিভিত্তিক যেই যুক্তি-প্রমাণ পেশ করেছেন, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া তাতে মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। কারণ তার মোকাবেলায় কুরআন-সুন্নাহর যুক্তি-প্রমাণ অনেক সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ, দ্ব্যর্থহীন ও হৃদয়গ্রাহী। তাই ইমাম ইবনে তাইমীয়া আল্লাহর সত্তা ও গুনাবলী এবং ঈমানের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে মুসলিমদের উপর যা আবশ্যক, কুরআন-সুন্নাহর দলীলের আলোকে তিনি অত্যন্ত পরিস্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন। এসব বিষয়ে তিনি একাধিক মূল্যবান কিতাব রচনা করেছেন এবং দার্শনিক ও কালামীদের কঠোর সমালোচনা ও প্রতিবাদ করেন। এ বিষয়ে তার অন্যতম গ্রন্থ আল আকীদাতুল ওয়াসেতীয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই কিতাবে আল্লাহর অতি সুন্দর নাম, তাঁর সুউচ্চ গুণাবলী, আখেরাতের বিভিন্ন বিষয়সহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের প্রায় সকল বিষয়ই অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় উল্লেখ করেছেন।

৬৯৮ হিজরীর কোনো এক দিনে আসরের নামাযের পর এক বৈঠকে শাইখ এই মূল্যবান কিতাবটি লিখে শেষ করেছেন। শাইখ নিজেই এই কিতাব লিখার কারণ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, তাতারী শাসনাধীন ইসলামী সাম্রাজের মুসলিমদের মধ্যে যখন অজ্ঞতা ও যুলুম ছড়িয়ে পড়ল, দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা যখন প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হলো, চতুর্দিকে কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ল এবং সঠিক ইসলামী আকীদাহ মুসলিমগণ প্রায় ভুলেই যাচ্ছিল, তখন ইরাকের দক্ষিণাঞ্চল বসরা ও কূফার মধ্যকার ‘ওয়াসেত’ শহরের জনৈক কাযী শাইখের কাছে উপস্থিত হয়ে ইসলামী আকীদাহর বিষয়গুলো এক সাথে উল্লেখ করে একটি কিতাব লিখার অনুরোধ জানালেন। শাইখ জবাবে বললেন, আকীদাহর বিষয়ে লোকেরা তো অনেক কিতাবই রচনা করেছে। কিন্তু ওয়াসেতের কাযী চাপাচাপি করেই বললেন যে, আমি কেবল আপনার পক্ষ হতেই এ বিষয়ে একটি পুস্তক কামনা করছি। তখন তিনি আসরের নামাযের পর এক বৈঠকে এই কিতাবটি লিখে দিলেন। ওয়াসেতের কাযীর অনুরোধে এবং ওয়াসেতের অধিবাসীদের জন্য যেহেতু এই কিতাবটি লিখা হয়েছে, তাই এটিকে আকীদাতুল ওয়াসেতীয়া বলা হয়। সেই সাথে واسط অর্থ যেহেতু মধ্যবর্তী এবং এই কিতাবে যেহেতু মধ্যমপন্থী উম্মতের তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদাহগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে, তাই কিতাবটির নাম ‘আকীদাতুল ওয়াসেতীয়া’ হতে মানা নেই।

আকীদাতুল ওয়াসেতীয়ার বিষয়গুলো নিয়ে শাইখের সাথে সমকালীন আলেমদের একাধিক ‘মুনাযারা’ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার মধ্যে মিশরের তদানীন্তন সুলতানের পক্ষ হতে নিযুক্ত দামেস্কের গভর্ণরের উপস্থিতিতে ৭০৫ হিজরী সালের বিতর্ক অনুষ্ঠানটি অন্যতম। শাইখুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আকীদাহ ওয়াসেতীয়ার বিষয়গুলোর উপর তিনটি মুনাযারায় অংশ গ্রহণ করেছেন। এতে তিনি দ্বীনের সমস্ত মূলনীতি ও সহীহ আকীদাহর মাসআলাগুলো সংক্ষিপ্ত ও সহজ ভাষায় উল্লেখ করেছেন। এক কথায় বলতে গেলে, কিতাবটির মধ্যে তিনি আকীদাহর ক্ষেত্রে তর্কশাস্ত্রবিদদের মতামত ও বিদআতমুক্ত সালাফে সালেহীনের আকীদাহর বিবরণ দিয়েছেন। বলা হয়েছে যে, আশায়েরা এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরা ওয়াসেতীয়ায় সন্নিবেশিত আকীদাহগুলোর বিষয়ে যখন শাইখের চরম বিরোধিতা শুরু করলো, তখন শাইখুল ইসলাম তাদের সাথে চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, তোমরা উহা থেকে এমন একটি মাসআলা নিয়ে আসো, যাতে আমি কুরআন ও সু্ন্নাহর খেলাফ করেছি। শাইখুল ইসলামের মৃত্যু পর্যন্ত তারা ওয়াসেতীয়ার একটি মাসআলাকেও কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী হিসাবে প্রমাণ করতে পারেনি।

বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ সমাজের মুসলিমগণ সঠিক আকীদা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে তারা বহু সমস্যার সম্মুখীন। মুসলিমদের অধঃপতনের মূল কারণ হল দ্বীনের সঠিক আকীদা ও শিক্ষা বর্জন করে শির্ক ও বিদআতে জড়িয়ে পড়া।

বাংলাভাষী মুসলিম অঞ্চলগুলোতেও বয়ে যাচ্ছে শির্ক-বিদআতের সয়লাব। যারা আহলুস্ সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার দাবী করে তারাও সঠিক আকীদাহ হতে অনেক দূরে। শুধু তাই নয়, যারা সুস্পষ্ট কবর পূজা ও নানা রকম শির্ক-বিদআতে লিপ্ত তাদেরকেও সুন্নী বলে আখ্যায়িত করা হয়!!! আর এ কারণেই বিভ্রান্ত হচ্ছে আমাদের সমাজের সরল প্রাণ অগণিত মুসলিম।

বাংলা ভাষা এখন বাংলাদেশের সীমানা পার হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে কোটি কোটি বাংলাভাষী মুসলিম। বাংলাভাষী মুসলিমদের তুলনায় ইসলামী বই-পুস্তকের সংখ্যা কম বলেই মনে হয়। এখন পর্যন্ত আকীদাহর মৌলিক গ্রন্থগুলোর ব্যাখ্যাসহ সঠিক ও নির্ভুল অনুবাদ না হওয়া বাংলাভাষী মুসলিমদের সহীহ আকীদাহ সম্পর্কে অজ্ঞতার অন্যতম কারণ।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদাহ বর্ণনায় ওয়াসেতীয়া যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব, তাই মুসলিম উম্মাহর নিকট এটি বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। এর ছোট-বড় অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে। সম্ভবত অনুবাদও হয়েছে অনেক ভাষায়। ওয়াসেতীয়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ সমূহের মধ্য থেকে শাইখ ড: সালেহ ফাওযানের ব্যাখ্যাটি বাংলায় অনুবাদের জন্য বেছে নেয়ার কারণ হলো এটি সংক্ষিপ্ত ও সহজ সরল। বাংলাভাষী মুসলিমগণ যেহেতু এখনো আকীদাহর বড় বড় কিতাবগুলো পড়তে অভ্যস্থ হয়ে উঠেনি, তাই এটিই তাদের জন্য আকীদাহর জগতে প্রবেশের মূল ফটক হতে পারে ভেবে এবং বিশেষ করে জমঈয়তে আহলে হাদীছ বাংলাদেশ সৌদি আরব শাখার তত্ত্বাবধানে ওয়াসেতীয়ার এই ব্যাখ্যাটিই অনুবাদের জন্য নির্বাচন করা হয়। অতি অল্প সময়ের মধ্যে অনুবাদ সম্পন্ন হওয়ায় মহান স্রষ্টার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

এখানে আরেকটি কথা বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, তিন প্রকার তাওহীদের মধ্য থেকে শুধু তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত, তাকদীর, ঈমানের বিভিন্ন মাসআলা, আখেরাত সম্পর্কিত গায়েবী বিষয়সমূহ, খেলাফত ও সাহাবীদের ফযীলত এবং তদসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোই ওয়াসেতীয়ায় স্থান পেয়েছে। তাওহীদুল উলুহীয়ার বিষয়াদি এখানে আলোচিত হয়নি। সে হিসাবে এটি আকীদাহর পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ নয়; বরং তাতে আকীদার বিশেষ একটি দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে আকীদাহর যেসব বিষয় বাদ পড়েছে, তা অবগত হওয়ার জন্য আমাদের অন্যতম কিতাব শরহুল আকীদাহ আত্ তাহাবীয়া এবং আল্লামা হাফেয বিন আহমাদ আলহাকামী রচিত ‘নাজাতপ্রাপ্ত দলের আকীদাহ’ নামক বই দু’টি পড়ার অনুরোধ রইল। আর তাওহীদুল উলুহীয়ার বিষয়গুলো সঠিকভাবে বুঝার জন্য শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব রাহিমাহুল্লাহ কর্তৃক রচিত ‘কিতাবুত্ তাওহীদ’এর অন্যতম ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘কুররাতুল উয়ূন’ সংগ্রহ করা যেতে পারে। কিতাবুত্ তাওহীদের বহু ব্যাখ্যাগ্রন্থ থেকে ‘কুর্রাতুল উয়ূন’কে বাংলায় অনুবাদের জন্য বাছাই করার অন্যতম কারণ হলো, শাইখের নাতি সুবিখ্যাত আলেম আব্দুর রাহমান বিন হাসান হলেন এটির প্রণেতা। তিনি প্রথমে কিতাবুত্ তাওহীদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল মাজীদ’ রচনা করেন। অতঃপর এটিকে আরো সুন্দর ও সংক্ষিপ্ত করে আরেকটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম দেন, قرة عيون الموحدين বা তাওহীদপন্থীদের নয়নমণি।

আল্লাহর অশেষ কৃপায় বইগুলো পাঠকের হাতে তুলে দিতে পেরে তাঁর শুকরিয়া আদায় করছি। এতে যেসব ভুল-ভ্রান্তি রয়েছে, তা আমার ও শয়তানের পক্ষ হতে। সুবিজ্ঞ পাঠক সমাজের প্রতি বিশেষ নিবেদন, অনুবাদ জনিত কোন ভুল-ভ্রান্তি নযরে আসলে আমাদেরকে জানিয়ে কৃতজ্ঞ করবেন।

হে আল্লাহ! তুমি বইগুলোর লেখক, ভাষ্যকার, অনুবাদক, সম্পাদক ও ছাপানোর কাজে সহযোগিতাকারী, তত্বাবধানকারী এবং পাঠক-পাঠিকাদের সবাইকে উত্তম বিনিময় দান করো। আমীন


শাইখ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী
ashahed1975@gmail.com
মোবাইল +৮৮০১৭৩২৩২২১৫৯

আল্লামা ডঃ শাইখ সালেহ ফাওযান হাফিযাহুল্লাহর সংক্ষিপ্ত জীবনী

আল্লামা ডঃ শাইখ আল্লামা সালেহ বিন ফাওযান হাফিযাহুল্লাহ আলকাসীম অঞ্চলের বুরায়দাহ শহরের নিকটবর্তী শামাসীয়ার অধিবাসী। তিনি ১৯৩৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২৮ তারিখ মোতাবেক ১ রজব ১৩৫৪ হিজরী সালে জন্মগ্রহণ করেন। ছোট থাকতেই তাঁর পিতা ইনতেকাল করেন। অতঃপর তিনি ইয়াতীম অবস্থায় স্বীয় পরিবারে প্রতিপালিত হন। শহরের মসজিদের ইমামের নিকট তিনি কুরআনুল কারীম, কিরাআতের মূলনীতি এবং লিখা শিখেন।

শামাসিয়ায় ১৩৬৯ হিজরী সালে যখন সরকারী মাদরাসা চালু করা হয়, তখন তিনি সেখানে ভর্তি হন। অতঃপর বুরায়দা শহরস্থ ফয়সালীয়া ইবতেদায়ী মাদরাসায় ১৩৭১ হিজরী সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এ সময় তাকে ইবতেদায়ী মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। অতঃপর বুরায়দাতে ১৩৭৩ হিজরী সালে যখন ইসলামিক ইন্সটিটিউট খোলা হয়, তখন তিনি তাতে ভর্তি হন। ১৩৭৩ হিজরী সালে তিনি এখানে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর তিনি রিয়াদ শহরস্থ কুল্লীয়া শরীয়া বা শরীয়া কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি ১৩৮১ হিজরী সালে শিক্ষা সমাপনী ডিগ্রী লাভ করেন। অতঃপর তিনি একই প্রতিষ্ঠান থেকে ইসলামী ফিকাহর উপর এম,এ পাস করেন এবং একই বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন।

কর্ম জীবন:

শরঈয়া কলেজ থেকে ডিগ্রী অর্জন করার পর তিনি রিয়াদস্থ ইসলামিক ইন্সটিটিউটে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। অতঃপর তাকে শরঈয়া কলেজের শিক্ষক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। অতঃপর তাঁকে ইসলামী আকীদাহ বিভাগের উচ্চতর শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। অতঃপর তাঁকে বিচার বিষয়ক হায়ার ইন্সটিটিউটে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। অতঃপর তাঁকে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মেয়াদ শেষে তিনি পুনরায় সেখানে শিক্ষক হিসাবে ফিরে আসেন। অতঃপর তাকে ইসলামী গবেষণা ও ফতোয়া বিভাগের স্থায়ী কমিটির সদস্য নিয়োগ করা হয়। তিনি এখনো এই পদে বহাল রয়েছেন।

তিনি আরো যেসব সরকারী দায়িত্ব পালন করেন, তার মধ্যে هيئة كبار العلماء এর সদস্য, মক্কা মুকাররামায় অবস্থিত রাবেতার পরিচালনাধীন ইসলামী ফিকাহ একাডেমীর সদস্য, ইসলামী গবেষণা ও ফতোয়া বিভাগের স্থায়ী কমিটির সদস্য, হজ্জ মৌসুমে দাঈদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সদস্য এবং রিয়াদ শহরের মালায এলাকার আমীর মুতইব বিন আব্দুল আযীয আল-সউদ জামে মসজিদের ইমাম, খতীব ও শিক্ষক। তিনি সৌদি আরব রেডিওতে نور على الدرب নামক প্রোগ্রামে শ্রোতাদের প্রশ্নের নিয়মিত উত্তর প্রদান করেন।

এ ছাড়াও তিনি পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি, গবেষণা, অধ্যায়ন, পুস্তিকা রচনা, ফতোয়া প্রদান করাসহ বিভিন্নভাবে ইলম চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। এগুলো একত্র করে কতিপয় পুস্তক রচনা করা হয়েছে। তিনি মাস্টার্স ও ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জনার্থী অনেক ছাত্রের গবেষণা কর্মে তত্বাবধায়ন করেছেন।

শাইখের উস্তাদবৃন্দ:

১) মান্যবর শাইখ আব্দুর রাহমান বিন সা’দী

২) শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায

৩) আব্দুল্লাহ বিন হুমায়েদ

৪) শাইখ মুহাম্মাদ আলআমীন শানকিতী

৫) শাইখ আব্দুর রায্যাক আফীফী

৬) শাইখ সালেহ বিন আব্দুর রাহমান আসু সুকাইতী

৬) শাইখ সালেহ বিন ইবরাহীম আলবুলাইহী

৭) শাইখ মুহাম্মাদ বিন সুবাইল

৮) শাইখ আব্দুল্লাহ বিন সালেহ আলখুলাইফী

৯) শাইখ ইবরাহীম বিন উবাইদ আলআব্দ আল মুহসিন

১০) শাইখ হামুদ বিন উকালা আশ শুআইবী

১১) শাইখ সালে আলইল্লী আন্ নাসের

এ ছাড়াও আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ধার্মিক শাইখের কাছ থেকে হাদীছ, তাফসীর এবং আরবী ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন।

শাইখের ছাত্রগণ:

১) শাইখ ডঃ আব্দুল আযীয বিন মুহাম্মাদ আলসাদহান

২) শাইখ আলী বিন আব্দুর রাহমান আশ শিবিল

৩) শাইখ সাগীর বিন ফালেহ আলসাগীর

৪) শাইখ ইউসুফ বিন সা’দ আলজারীদ

৫) শাইখ সালেহ বিন আব্দুল্লাহ বিন হামাদ আলউসাইমী

৬) শাইখ সালেহ বিন আব্দুল্লাহ বিন হামাদ আলউসাইমী

৭) মাসজিদুল হারামের ইমাম শাইখ আব্দুর রাহমান বিন সুদাইস

৮) মসজিদে নববীর ইমাম শাইখ আব্দুল মুহসিন আল কাসিম

৯) শাইখ সালেহ বিন ইবরাহীম আলুস শাইখ

১০) শাইখ আয্যাম মুহাম্মাদ আল শুআইর

এ ছাড়াও তাঁর অনেক ছাত্র রয়েছে। তারা নিয়মিত তাঁর মজলিসে এবং নিয়মিত দারসগুলোতে অংশ গ্রহণ করতেন।

শাইখের ইলমী খেদমত:

লেখালেখির কাজে রয়েছে শাইখের অনেক খেদমত। তার মধ্য থেকে নিম্নে কতিপয় গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলো।

১) التحقيقات المرضية في المباحث الفرضية এটি ইলমে ফারায়েযের উপর রচিত শাইখের একটি কিতাব। এটি ছিল মাস্টার্স পর্বে তাঁর গবেষণার বিষয়। বইটি এক খন্ডে ছাপানো হয়েছে।

২) أحكام الأطعمة في الشريعة الإسلامية ইসলামী শরীয়তে খাদ্যদ্রব্যের বিধিবিধান।

৩) الإرشاد إلى صحيح الاعتقاد আকীদাহ সংশোধন। এটি বাংলায় অনুবাদ হয়েছে। এর বাংলা নাম আমরা দিয়েছি কুরআন ও সহীহ হাদীছের আলোকে আকীদাহ সংশোধন।

৪) شرح العقيدة الواسطية আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্যতম ইমাম শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়ার আল আকীদাতুল ওয়াসেতীয়ার ব্যাখ্যা এটি। বাংলায় অনুবাদ হয়েছে।

৫) البيان فيما أخطأ فيه بعض الكتاب এটি একটি বড় মাপের কিতাব। এতে তিনি বিভিন্ন কিতাবের ভুল-ভ্রান্তি তুলে ধরেছেন।

৬) مجموع محاضرات في العقيدة والدعوة আকীদাহ ও দাওয়া বিষয়ে শাইখের বিভিন্ন লেকচার এখানে জমা করে বই আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

৭) الخطب المنبرية في المناسبات العصرية যুগোপযোগী অনেক বিষয়কে একত্র করে জুমআর খুৎবা হিসাবে লিখা হয়েছে। এটি দুই খন্ডে ছাপানো হয়েছে।

৮) ইসলামের সংস্কারক ইমামগণ

৯) বিভিন্ন বিষয়ে পুস্তিকা

১০) বিদআত থেকে সাবধান। বাংলায় অনুবাদ হয়েছে।

১১) مجموع فتاوى في العقيدة والفقه ফতোয়া ও আকীদাহ বিষয়ক সংকলন

১২) شرح كتاب التوحيد- للإمام محمد بن عبد الوهاب এটি শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব রাহিমাহুল্লাহর লিখিত কিতাবুত তাওহীদের ব্যাখ্যা।

১৩) الملخص الفقهي ফিকাহর উপর লিখিত শাইখের এটি একটি বিশাল কিতাব।

১৪) إتحاف أهل الإيمان بدروس شهر رمضان রামাযান মাসের জন্য খাস করে অনেকগুলো দারস এখানে জমা করা হয়েছে।

১৫) হজ্জ ও উমরাহকারীর জন্য যা করণীয়

১৬) কিতাবুত তাওহীদ। এটি সৌদি আরবের স্কুলসমূহে পাঠ্যপুস্তক হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে।

১৭) কিতাবুদ দাওয়া

১৮) রামাযানুল মুবারকের মজলিস

১৯) আকীদাতুত তাওহীদ

২০) كشف الشبهات এর ব্যাখ্যা।

২১) যাদুল মুসতাকনি

২২) الملخص في شرح كتاب التوحيد এটি কিতাবুত্ তাওহীদের ব্যাখ্যা।

২৩) شرح مسائل الجاهلية এটি জাহেলী যুগের অনেক শির্ক, কুফর এবং কুসংস্কারের প্রতিবাদে লিখিত হয়েছে।

২৪) حكم الاحتفال بذكرى المولد النبوي নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মদিবস উপলক্ষে মীলাদ উদ্যাপন করা।

২৫) الإيمان بالملائكة وأثره في حياة الأمة ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান এবং মানব জীবনে তার প্রভাব।

২৬) مجمل عقيدة السلف الصالحসালাফদের আকীদাহর সংক্ষিপ্ত পরিচয়

২৭)حقيقة التصوف সুফীবাদের হাকীকত।

২৮) من مشكلات الشباب যুবকদের সমস্যা

২৯) وجوب التحاكم إلى ما أنزله الله আল্লাহর বিধান দিয়ে বিচার-ফয়সালা করা আবশ্যক

৩০) من أصول عقيدة أهل السنة والجماعة আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদাহ

৩১) دور المرأة في تربية الأسرة পরিবার পরিচালনায় নারীর ভূমিকা

৩২) معنى لا إله إلا اللهলা-ইলাহা ইল্লাল্লাহএর ব্যাখ্যা

৩৩) شرح نواقض الإسلام ইসলাম ভঙ্গকারী বিষয়সমূহের ব্যাখ্যা

৩৪) التوحيد في القران কুরআনুল কারীমে তাওহীদ

৩৫) سلسلة وصايا وتوجيهات للشباب ১-৪ যুবকদের জন্য কতিপয় উপদেশ ও নির্দেশনা সিরিজ ১-৪

শাইখের প্রশংসায় বিভিন্ন আলেমের মন্তব্য:

সৌদি আরবে যেসব বিজ্ঞ ও প্রসিদ্ধ আলেম এখনো জীবিত আছেন, তাদের মধ্যে শাইখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, শাইখ বিন বায রাহিমাহুল্লাহকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনার পরে আমরা কার কাছে দ্বীনের বিষয়াদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবো? জবাবে বিন বায রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আপনারা সালেহ ফাওযানকে জিজ্ঞাসা করবেন। এমনি শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, আমরা আপনার পরে কাকে জিজ্ঞাসা করবো? তিনি জবাব দিলেন যে, আপনারা সালেহ ফাওযানকে জিজ্ঞাসা করবেন। কেননা তিনি একজন ফকীহ এবং ধার্মিক। শাইখ বিন গুদাইয়্যান প্রায়ই বলতেন, আপনারা দ্বীনের ব্যাপারে শাইখ সালেহ ফাওযানকে জিজ্ঞাসা করবেন। আল্লাহ যেন তাঁর আনুগত্যের উপর তাঁর বয়স বৃদ্ধি করেন, তাঁর শেষ পরিণাম যেন ভালো করেন এবং যেন হকের উপর তাঁকে টিকিয়ে রাখেন।

আমরা শাইখের জন্য দুআ করি, তিনি যেন তাঁর হায়াতে বরকত দান করেন এবং দ্বীনের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তা যেন কবুল করেন। আল্লাহুম্মা আমীন।

আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য সত্য দ্বীনসহ যুগে যুগে অগণিত নবী রাসূল প্রেরণ করেছেন। নির্ভেজাল তাওহীদই ছিল নবী-রাসূলদের দ্বীনের মূল বিষয়। পৃথিবীর মানুষেরা এই তাওহীদকে যখনই ভুলে গেছে, তখনই তা পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন নতুন নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আগমণ করেন সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর দাওয়াতের মূল বিষয়ও ছিল এই তাওহীদ। মক্কায় অবস্থান করে একটানা ১৩ বছর তিনি তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। অতঃপর মদীনায় হিজরত করে তাওহীদের দাওয়াত অব্যাহত রেখেছেন। উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানগণ তাঁর এই দাওয়াত গ্রহণ করলো এবং তারা তাঁর সাহায্য করলো। আল্লাহ তাআলা অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করলেন। আরব উপদ্বীপসহ পৃথিবীর সর্বত্রই এই দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে গেল। তাওহীদের মাধ্যমে তারা সমগ্র জাতির উপর যে গৌরব, সম্মান, শক্তি, প্রতিপত্তি এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে মুসলিমগণ দুর্বল হয়ে পড়ে। মুসলিমদের শক্তির মূলভিত্তি এই নির্ভেজাল তাওহীদের উপর শির্ক ও কুসংস্কারের আবর্জনা পড়ে যাওয়াই মুসলিমদের বিপর্যস্তের প্রধান ও মূল কারণ।

ইসলামের এই মূলভিত্তি নির্ভেজাল তাওহীদ থেকে যখনই মুসলিম জাতি দূরে চলে গেছে, দ্বীনি লেবাসে বিভিন্ন সময় শির্ক, বিদআত, কুসংস্কার ও বিজাতীয় আচার-আচরণ মুসলিমদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে, তখনই নির্ভেজাল তাওহীদের দিকে জাতিকে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং সকল প্রকার আবর্জনা থেকে তাওহীদকে পরিস্কার ও পরিশুদ্ধ করার জন্য ইসলামের স্বর্ণযুগের পরে আল্লাহ তাআলা বহু মর্দে মুজাহিদ প্রেরণ করেছেন। তারা পথহারা জাতিকে সুপথে ফিরিয়ে এনেছেন, তাওহীদের দাওয়াতকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন এবং দ্বীনকে সকল প্রকার শির্ক-বিদআত থেকে সংস্কার ও সংশোধন করেছেন। তাদেরই ধারাবাহিকতায় হিজরী সপ্তম ও অষ্টম শতকে আগমণ করেন বিপ্লবী সংস্কারক শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া রাহিমাহুল্লাহ। বহু প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এবং জেল-যুলুম সহ্য করে তাওহীদ পুনরুদ্ধার ও সংস্কারে তিনি যে অতুলনীয় অবদান ও খেদমত রেখে গেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম জাতির জন্য তা দিশারী হয়ে থাকবে। তাঁর বরকতময় জীবনী, দাওয়াত ও সংস্কারের সকল দিক উল্লেখ করতে গেলে বড় মাপের একটি গ্রন্থ রচনা করা দরকার। তাই আমরা স্বল্প পরিসরে শাইখের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, জীবনী ও সংস্কার আন্দোলনের কিছু দিক এখানে উল্লেখ করেছি।

নাম, জন্ম ও বংশ পরিচয়:

তিনি হলেন আবুল আববাস তকীউদ্দীন শাইখুল ইসলাম ইমাম আহমাদ বিন আব্দুল হালীম বিন আব্দুস সালাম ইবনে তাইমীয়া রাহিমাহুল্লাহ। ৬৬১ হিজরী সালের ১০ রবীউল আওয়াল মাসে তিনি বর্তমান সিরিয়ার হারান এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল হালীম ইবনে তাইমীয়া এবং দাদা আবুল বারাকাত মাজদুদ্দীন আব্দুস্ সালাম বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ ও হাম্বলী ফিকাহবিদ ছিলেন। সে হিসাবে তিনি এমন একটি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যার সকল সদস্যই ছিলেন আলেম ও দ্বীনদার। আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করার কারণে শিশুকালেই তিনি ইলম অর্জনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। উল্লেখ্য যে, আলেমদের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী তাইমীয়া ছিলেন শাইখের নানী। তিনি ওয়াজ-নসীহত ও ভাষণ-বক্তৃতা দানে খুবই পারদর্শী ছিলেন।

ইমামের বয়স যখন সাত বছর, তখন মুসলিম অঞ্চলগুলো তাতারীদের আক্রমণের শিকার হয়। শাইখের জন্মস্থান হারান এলাকা তাতারীদের আক্রমণের কবলে পড়লে মানুষ জানের ভয়ে সবকিছু পানির দামে বিক্রি করে পালাচ্ছিল। এই ভীতি ও আতঙ্কের দিনে ইমামের পরিবারবর্গও দেশ ত্যাগের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করলেন। তারা প্রয়োজনীয় সবকিছু ফেলে দিয়ে শুধু পারিবারিক লাইব্রেরীর বই-পুস্তকগুলো গাড়ী বোঝাই করলেন। শুধু কিতাবেই কয়েকটি গাড়ি পরিপূর্ণ হয়ে গেল। গাড়ীগুলো টানার জন্য প্রয়োজনীয় ঘোড়া ও গাধাও ছিলনা। তাই গাধার পাশাপাশি পরিবারের যুবক সদস্যদেরও মাঝে মাঝে কিতাবের গাড়ী টানতে হতো।

দামেস্কে পৌঁছার পর তথাকার লোকেরা শাইখের পরিবারকে অভ্যর্থনা জানালো। দামেস্কবাসীরা শাইখের পিতা ও দাদার জ্ঞান ও পান্ডিত্যের খ্যাতির কথা আগে থেকেই অবহিত ছিল। পিতা আব্দুল হালীম দামেস্কের বড় মসজিদ জামে উমুবীতে দারস দেয়ার দায়িত্ব লাভ করলেন। শীঘ্রই তাদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে এলো।

কিশোর ইবনে তাইমীয়া অল্প সময়ের মধ্যেই কুরআন মজীদ মুখস্ত করে হাদীছ, ফিক্হ ও আরবী ভাষা চর্চায় মশগুল হলেন। সেই সাথে তিনি পিতার সাথে বিভিন্ন ইলমী মজলিসে শরীক হতে লাগলেন।

ইমামের খান্দানের সবাই মেধাবী ছিলেন। কিন্তু তাদের তুলনায় ইমামের স্মরণ শক্তি ছিল অসাধারণ। শিশুকাল থেকে তাঁর অসাধারণ স্মরণশক্তি শিক্ষকদের অবাক করে দিয়েছিল। দামেস্কের লোকদের মুখে মুখে তাঁর স্মরণশক্তির কথা আলোচনা হতো।

একদা আলেপ্পো নগরীর একজন বিখ্যাত আলেম দামেস্কে আসেন। তিনি কিশোর ইবনে তাইমীয়ার স্মরণশক্তির কথা লোকমুখে আগেই শুনেছিলেন। ইমামের স্মরণশক্তি পরীক্ষা করার জন্য তিনি একটি দর্জির দোকানে বসে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে একদল ছেলেকে আসতে দেখা গেলো। দর্জি ইঙ্গিতের মাধ্যমে ইমামকে দেখিয়ে দিল। তিনি ইমামকে ডাকলেন। ইমামের খাতায় হাদীছের তের-চৌদ্দটি মতন লিখে দিয়ে বললেন, পড়ো। কিশোর ইমাম ইবনে তাইমীয়া গভীর মনোযোগের সাথে হাদীছগুলো একবার পড়লেন। তিনি এবার খাতা উঠিয়ে নিয়ে বললেন, মুখস্ত শুনিয়ে দাও। ইবনে তাইমীয়া তা মুখস্ত শুনিয়ে দিলেন। এবার একগাদা সনদ লিখে দিয়ে পড়তে বললেন। পড়া হলে মুখস্ত বলতে বললেন। ইমাম সনদগুলোও মুখস্ত বললেন। শাইখ এতে অবাক হয়ে বললেন, বড় হয়ে এই ছেলে অসাধ্য সাধন করবে।

ইমাম ইবনে তাইমীয়া মাত্র সাত বছর বয়সে শিক্ষালয়ে প্রবেশ করেন এবং মাত্র বাইশ বছর বয়সে তাঁর জ্ঞানের ভান্ডার পরিপূর্ণ করে তুলেন। কুরআন, হাদীছ, ফিকাহ এবং উসূলের সাথে সাথে তিনি আরবী ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি দুই শতাধিক উস্তাদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। কুরআনের তাফসীরের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল সবচেয়ে বেশী। যেসব উস্তাদদের কাছ থেকে তিনি জ্ঞান অর্জন করেছেন, তাদের মধ্যে ইবনে কুদামা, ইবনে আসাকেরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একটানা সাত থেকে বাইশ বছর পর্যন্ত জ্ঞান লাভের পর শিক্ষকতা ও জ্ঞান বিস্তারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বাইশ বছর বয়সে উপনীত হলে তার পিতা আব্দুল হালীম ইবনে তাইমীয়া মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন দামেস্কের সর্ববৃহৎ দারুল হাদীছের প্রধান মুহাদ্দিছ। আব্দুল হালীমের মৃত্যুর পর এই পদটি শূন্য হয়ে যায়। সুযোগ্য পুত্র ইমাম ইবনে তাইমীয়া সেই পদ পূরণ করেন। তাঁর দারসে যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ ও আলেমগণ উপস্থিত হতে শুরু করেন। যুবক আলেমের জ্ঞান ও পান্ডিত্য সবাইকে মুগ্ধ ও চমৎকৃত করে। কিছু দিন পরেই দামেস্কের প্রধান মসজিদ জামে উমুবীতে তিনি পিতার স্থানে কুরআনের তাফসীর করার দায়িত্বে নিযুক্ত হন। তাঁর জন্য বিশেষভাবে মিম্বার তৈরী করা হয়। প্রতি সপ্তাহেই তাঁর তাফসীরের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং ছাত্রের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। কুরআনের তাফসীরের সাথে সাথে সমকালীন সব সমস্যার কুরআনিক সমাধান বর্ণনা করতেন।

তাঁর হাতে তৈরী হয় যুগশ্রেষ্ঠ অসংখ্য আলেম। তাদের মধ্য হতে স্বনামধন্য লেখক ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ইমাম ইবনে কাছীর এবং ইমাম যাহাবীর নাম সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।

তিনি যেই পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, তার সকলেই ছিলেন আলেম। তারা ফিক্হের ক্ষেত্রে হাম্বলী মাজহাবের অনুসরণ করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নির্দিষ্ট কোন মাজহাবের তাকলীদ করতেন না। কুরআন ও সুন্নাহর দলীলের অনুসরণ করতেন, সুন্নাতের সাহায্য করতেন এবং সালাফী নীতি গ্রহণ করতেন। সুন্নাত ও সালাফী নীতির পক্ষে তিনি এমন এমন যুক্তি-প্রমাণ পেশ করতেন, যা তাঁর পূর্বে অন্য কেউ পেশ করার সাহসিকতা প্রদর্শন করতেন না।

তাতারীদের আক্রমণের খবর যখন সিরিয়ায় পৌছল, তখন সিরিয়ার বিভিন্ন শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। তাতারীদের ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে মুসলিমগণ আগেই অবহিত ছিল। তাই তাদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আশপাশের সকল এলাকা ছেড়ে লোকেরা রাজধানী দামেস্কের দিকে চলে আসতে লাগল। দামেস্কের লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেল। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে খবর আসলো যে, মিশরের বাদশাহ প্রচুর সেনাবাহিনীসহ দামেস্কের মুসলিমদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসছেন। এই খবর শুনে নগরীতে প্রাণের সাড়া জাগল। মুসলিমগণ নতুন উদ্যমে যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্ততি নিতে লাগল।

৬৯৯ হিজরীর ২৭ রবীউল আওয়াল মাসে তাতারী সম্রাট কাজানের সাথে মিশরের সুলতানের সংঘর্ষ হলো। অনেক চেষ্টা করেও এবং অসীম সাহসিকতার সাথে লড়াই করেও মুসলিমরা শেষ রক্ষা করতে পারলোনা। মুসলিমরা হেরে গেল। মিশরের সুলতান পরাজিত সেনাবাহিনী নিয়ে কায়রোর পথে রওয়ানা হলেন।

এবার দামেস্কবাসীরা পড়লো মহাসংকটে। তাতারী সম্রাট সেনাদলসহ এবার বিজয়ী বেশে নগরে প্রবেশ করবে। তাতারী বিভীষিকার কথা চিন্তা করে বড় বড় আলেম ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা শহর ত্যাগ করতে লাগল। এর আগেই শহরের বিচারক, পরিচিত আলেম-উলামা, সরকারী অফিসার, বড় বড় ব্যবসায়ী এমনকি দামেস্কের গভর্ণর নিজের শহরের মায়া ত্যাগ করে মিশরের পথে পাড়ি জমালেন। জনগণের এক অংশও তাতারীদের হত্যাকান্ডের ভয়ে দামেস্ক ছেড়ে দিল। এখন কেবল সাধারণ জনগণের একটি অংশই দামেস্কে রয়ে গেল।

এদিকে কাজানের সেনাদল দামেস্কে প্রবেশের সময় ঘনিয়ে আসছিল। এই ভয়ানক পরিস্থিতিতে ইমাম ইবনে তাইমীয়া এবং শহরের নেতৃস্থানীয় লোকেরা বসে একটা সিদ্বান্ত গ্রহণ করলেন। তারা সিদ্বান্ত নিলেন, ইমাম ইবনে তাইমীয়ার নেতৃত্বে নগরবাসীদের একটি প্রতিনিধি দল কাজানের নিকট যাবে। তারা নগরবাসীদের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার একটি ফরমান লিখে আনবে।

এ উদ্দেশ্যে তাতারী সম্রাট কাজানের সামনে দলবল নিয়ে উপস্থিত হলেন ইসলামের অগ্রদূত ইমাম ইবনে তাইমীয়া রাহিমাহুল্লাহ। কাজানের সম্মুখে ইমাম কুরআন-হাদীছের উদ্ধৃতি দিয়ে ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে এবং যুলুম নির্যাতনের বিপক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ভাষণ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি নির্ভয়ে কথা বলে যাচ্ছিলেন এবং কাজানের কাছাকাছি হচ্ছিলেন। তাঁর আওয়াজ ধীরে ধীরে উঁচু ও গুরুগম্ভীর হচ্ছিল। কুরআনের আয়াত ও হাদীছ শুনাতে শুনাতে তিনি কাজানের নিকটে, আরো নিকটে চলে যাচ্ছিলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো পরাক্রমশালী কাজান এতে মোটেই বিরক্তিবোধ করছিলেন না। বরং তিনি কান লাগিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন। ইতিমধ্যেই কাজান ইমামের ভাষণে সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে গেলেন। ইমামের ভাষণ কাজানকে অনুবাদ করে শুনানো হলে তিনি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এই আলেমটি কে? আমি এমন সাহসী ও দৃঢ় সংকল্প লোক আজকের পূর্বে আর কখনো দেখিনি। ইতিপূর্বে আমাকে অন্য কেউ এমন প্রভাবিত করতে পারেনি।

লোকেরা ইবনে তাইমীয়া সম্পর্কে কাজানকে জানালো এবং ইমামের ইলম ও কার্যাবলী সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করলো।

ইমাম ইবনে তাইমীয়া কাজানকে সেদিন বলেছিলেন, হে কাজান! আপনি নিজেকে মুসলিম বলে দাবী করেন। আমি জানতে পেরেছি, আপনার সাথে রয়েছেন কাযী, শাইখ, মুআয্যিন এবং ইমামগণ। এসব সত্ত্বেও আপনি মুসলিমদের উপর আক্রমণ করেছেন, তাদেরকে হত্যা করেছেন, তাদের নারীদেরকে বন্দী করেছেন এবং মুসলিমদের মালামাল লুণ্ঠন করেছেন। অথচ আপনার পিতা ও দাদা কাফের হওয়া সত্ত্বেও এ ধরণের কাজ করতে ইতস্ততঃ করতেন। তারা নিজেদের ওয়াদা-অঙ্গীকার পালন করেছেন। আর আপনি ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। আপনি আল্লাহর বান্দাদের উপর মারাত্মক যুলুম করেছেন।

সে সময় ইমামের সাথে ছিলেন প্রধান বিচারপতি নাজমুদ্দীন আবুল আববাস। তিনি লিখেছেন, ইবনে তাইমীয়া যখন কাজানের সাথে কথা শেষ করলেন, তখন তাঁর ও সাথীদের সামনে খাবার রাখা হলো। সবাই খেতে লাগলেন। কিন্তু ইমাম হাত গুটিয়ে নিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন, এ খাবার হালাল নয়। কারণ গরীব মুসলিমদের থেকে লুট করা ছাগল ও ভেড়ার মাংস সংগ্রহ করা হয়েছে এবং মযলুম মানুষের কাছ থেকে জোর করে কাঠ সংগ্রহ করে তা পাকানো হয়েছে।

অতঃপর কাজান ইমামকে দুআ করার আবেদন করলেন। ইমাম দু’আ করতে লাগলেন। দু’আতে তিনি বললেন, হে আল্লাহ! এই যুদ্ধের পিছনে কাজানের উদ্দেশ্য যদি হয় তোমার দ্বীনকে সাহায্য করা, তোমার কালেমাকে বুলন্দ করা এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা, তাহলে তুমি তাঁকে সাহায্য করো। আর যদি দুনিয়ার রাজত্ব লাভ এবং লোভ-লালসা চরিতার্থ করাই তার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে তুমিই তাকে ধ্বংস করো। আশ্চর্যের বিষয় হলো ইমাম দুআ’ করছিলেন, আর কাযান আমীন আমীন বলে যাচ্ছিলেন।

কাযী আবুল আববাস নাজমুদ্দীন বলেন, ইমাম যখন কাযানের সামনে বক্তৃতা করছিলেন, তখন আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম এবং নিজেদের জামা-কাপড় গুটিয়ে নিচ্ছিলাম। কি জানি কখন ইমামের উপর জল্লাদের তরবারী ঝলসে উঠবে এবং তার রক্তে আমাদের বস্ত্র রঞ্জিত হবে। কাযী নিযাম উদ্দীন আরো বলেন, কাযানের দরবার থেকে বের হয়ে এসে আমরা ইমামকে বললাম, আমরা আপনার সাথে যাবোনা। আপনি তো আমাদেরকে প্রায় মেরে ফেলার ব্যবস্থা করেছিলেন এবং আপনার কারণে আমাদের উপর বিরাট মসীবত চলে আসার উপক্রম হয়েছিল। ইমাম তখন ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, বরং আমিই তোমাদের সাথে যাবোনা। অতঃপর আমরা সকলেই তাঁকে রেখে চলে আসলাম। ইমাম একাই রওয়ানা দিলেন। রওয়ানা দেয়ার সময় কাযান আবার দুআ করার আবেদন করলেন। ইমাম পূর্বের দুআর পুনরাবৃত্তি করলেন।

ইমামকে একাকী চলতে দেখে স্বয়ং কাযান একদল সৈন্য পাঠিয়ে ইমামের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন। ইমামের একাকীত্বের খবর শুনে শহরের একদল লোক বের হয়ে এসে ইমামকে সঙ্গ দেয়ার কথাও জানা যায়। কাযী নাজমুদ্দীন আবুল আববাস বলেন, ইমাম নিরাপদে দামেস্কে ফিরে এলেন। ঐদিকে আমাদের অবস্থা এতই শোচনীয় হলো যে, রাস্তায় একদল লুটেরা বাহিনী আমাদের উপর আক্রমণ করলো এবং সর্বস্ব খুইয়ে নিল। আমরা একদম উলঙ্গ হয়ে শহরে ফিরলাম।

অত্যন্ত মর্যাদার সাথে ইমাম তাতারীর দরবার থেকে ফিরে আসলেন এবং নগরবাসীর জন্য নিরাপত্তার পরোয়ানা লিখিয়ে আনলেন। তাতারীরা যাদেরকে বন্দী করেছিল, তাদেরকেও ছাড়িয়ে আনলেন। তাতারীদের বর্বরতার কাহিনী তিনি যেমন শুনেছিলেন, তেমনি নিজ চোখেও তাদের তান্ডব দেখেছিলেন। তারপরও তিনি একটুও বিচলিত হননি। তাতারী সম্রাটের মুখোমুখি হয়ে কথা বলতে এবং তাতারী সেনাদের মধ্যে অবাধে চলাফেরা করতে তিনি একটুও ভীতি অনুভব করেন নি। তিনি বলতেন, যার অন্তরে রোগ আছে সেই কেবল আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ভয় করতে পারে।

আল্লাহর দ্বীনকে সকল প্রকার কুসংস্কার-আবর্জনা ও শির্ক-বিদআত হতে পরিস্কার করার জন্য শাইখ যেমন আমরণ কলম ও জবান দ্বারা জিহাদ করেছেন, ঠিক তেমনি শাইখুল ইসলাম তাতারীদের বিরুদ্ধে সসস্ত্র সংগ্রাম করে ময়দানে বিশেষ বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। মুসলিম উম্মাহর অস্তীত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে তাতারীদের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য মুসলিমদেরকে তিনি যেমন উৎসাহ দিয়েছেন, তেমনি নিজেও ময়দানে নেমে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ইতিপূর্বে সম্রাট কাযানের নিকট প্রবেশ করে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে তার সাহসিকতা দেখে উপস্থিত সকলেই মুগ্ধ হয়েছিল। ৭০২ হিজরী সালের রামাযান মাসে তাতারীদের বিরুদ্ধে সিরিয়ার শাকহব নামক অঞ্চলে যেই যুদ্ধ হয়েছিল, তাতে তিনি মুজাহিদদের কাতারের সর্বাগ্রে ছিলেন। আল্লাহ তাআলা এই যুদ্ধে তাতারীদের বিরুদ্ধে মুসলিমদেরকে বিজয় দান করেন। এমনি আরো অনেক যুদ্ধেই তিনি বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন। মিশরের সুলতান যখন তাতারীদের হাতে দেশ সমর্পন করে দিতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি সুলতানকে ধমক দিয়েছিলেন। জিহাদের প্রতি মুসলিমদেরকে উৎসাহ প্রদান এবং নিজে ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার ফলে মুসলিমদের অন্তর থেকে তাতারী আতঙ্ক দূরিভূত করে। আল্লাহর দ্বীনের প্রতি মুসলিমদের অবহেলার কারণে তাদের কপালে যেই দুর্দশা নেমে এসেছিল, কুরআন ও সুন্নাহর পথ বর্জন করার ফলে তারা রাজনৈতিকভাবে যে দুর্বলতা ও বিপর্যয়ের কবলে পড়েছিল, ইমাম ইবনে তাইমীয়ার সংস্কার ও জিহাদী আন্দোলনে মুসলিমরা নতুন করে জেগে উঠেছিল। মুসলিমগণ নতুন করে জিহাদী চেতনা ফিরে পায়। তাতারীরা ইসলামী সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র বাগদাদ দখল করে খলীফাকে যবাই করে এবং লক্ষ লক্ষ মুসলিমের রক্তে রাজপথ রক্তাক্ত করে তাতারীরা যেভাবে একের পর এক অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সিরিয়ার দামেস্ক এবং মিশরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন ইবনে তাইমীয়া মুসলিমদেরকে সুসংগঠিত করে সিরিয়া ও মিশরের দিকে তাতারীদের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে না দিলে মুসলিমদের ভাগ্যাকাশ কেমন হতো, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।

অন্যায় ও অপকর্ম নির্মূলে ইবনে তাইমীয়া

তাতারীরা দামেস্ক ছেড়ে চলে যাওয়ার পর শহরে প্রকাশ্যে মদ পানসহ নানা অপকর্ম ব্যাপকতা লাভ করে। কারণ তখন সিরিয়া এক সরকারী নিয়ন্ত্রণহীন ছিল। তাই ইমাম ইবনে তাইমীয়া রাহিমাহুল্লাহ একদল ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে শহরে প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন এবং মদের দোকানগুলোতে ঢুকে পড়েন। মদের পেয়ালা ও কুঁজো ভেঙ্গে ফেলতে লাগলেন এবং দোকানের মদ নালায় ঢেলে দিলেন। অন্যায় ও অপকর্মের আস্তানায় প্রবেশ করে লোকদেরকে উপদেশ দিতেন, ইসলামের নির্দেশ বুঝাতেন এবং তাওবা করাতেন। প্রয়োজনে শাস্তিও দিতেন। ইমামের অভিযানে সারা দামেস্ক শহর পুনরায় দ্বীনি পরিবেশ ফিরে পেল।

দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ১১২ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 5 6 · · · 9 10 11 12 পরের পাতা »