بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
৪১ সূরাঃ হা-মীম আস-সাজদা | Fussilat | سورة فصلت - আয়াত সংখ্যাঃ ৫৪ - মাক্কী
৪১:১ حٰمٓ ۚ﴿۱﴾

হা-মীম। আল-বায়ান

হা-মীম। তাইসিরুল

হা মীম। মুজিবুর রহমান

১. হা-মীম।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১) হা-মীম,

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৪১:২ تَنۡزِیۡلٌ مِّنَ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ۚ﴿۲﴾

(এ গ্রন্থ) পরম করুণাময় অসীম দয়ালুর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। আল-বায়ান

পরম দয়াময়, পরম দয়ালুর নিকট হতে অবতীর্ণ। তাইসিরুল

ইহা দয়াময়, পরম দয়ালুর নিকট হতে অবতীর্ণ। মুজিবুর রহমান

২. এটা রহমান, রহীমের কাছ থেকে নাযিলকৃত

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(২) (এ) অনন্ত করুণাময়, পরম দয়ালুর নিকট হতে অবতীর্ণ।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৪১:৩ کِتٰبٌ فُصِّلَتۡ اٰیٰتُہٗ قُرۡاٰنًا عَرَبِیًّا لِّقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ ۙ﴿۳﴾

এমন এক কিতাব, যার আয়াতগুলো জ্ঞানী কওমের জন্য বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, কুরআনরূপে আরবী ভাষায়। আল-বায়ান

এক কিতাব, যার আয়াতগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যাকৃত, আরবী ভাষার কুরআন, জ্ঞানসম্পন্ন মানুষদের জন্য। তাইসিরুল

এটা এক কিতাব, বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে এর আয়াতসমূহ আরাবী ভাষায়, কুরআনরূপে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য – মুজিবুর রহমান

৩. এক কিতাব, বিশদভাবে বিবৃত হয়েছে এর আয়াতসমূহ, কুরআনরূপে আরবী ভাষায়, জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য,

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩) এমন এক গ্রন্থ যা আরবী কুরআনরূপে[1] এর বাক্যসমূহকে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য[2] বিশদভাবে বিবৃত করা হয়েছে। [3]

[1] এটা ‘হাল’ (যা পূর্বোক্তের অবস্থা বর্ণনা করে) অর্থাৎ, এর শব্দগুলো আরবী ভাষায়। যার অর্থ বিশ্লেষিত ও সুস্পষ্ট।

[2] অর্থাৎ, যারা আরবী ভাষা, তার অর্থ ও ভাবার্থ এবং তার রহস্য ও বাচনভঙ্গি ইত্যাদি জানে।

[3] অর্থাৎ, হালাল কি এবং হারাম কি? অথবা আনুগত্য কি এবং অবাধ্যতা কি? কিংবা নেকীর কাজ কোন্গুলো এবং শাস্তি পেতে হয় এমন কাজ কোনগুলো?

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৪১:৪ بَشِیۡرًا وَّ نَذِیۡرًا ۚ فَاَعۡرَضَ اَکۡثَرُہُمۡ فَہُمۡ لَا یَسۡمَعُوۡنَ ﴿۴﴾

সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, অতএব তারা শুনবে না। আল-বায়ান

সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারী। কিন্তু ওদের অধিকাংশই (এ কুরআন থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, কাজেই ওরা শুনবে না। তাইসিরুল

সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিমুখ হয়েছে। সুতরাং তারা শুনবে না। মুজিবুর রহমান

৪. সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অতএব, তারা শুনবে না।(১)

(১) আলোচ্য সূরায় কুরাইশ কাফেরদের প্রত্যক্ষভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। তারা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর প্রাথমিক যুগে বলপূর্বক ইসলামকে নস্যাৎ করার এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার প্রতি বিশ্বাসীদেরকে নানাভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে ভীত-সন্ত্রস্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু ইসলাম তাদের মর্জির বিপরীতে দিন দিন সমৃদ্ধ ও শক্তিশালীই হয়েছে। প্রথমে ওমর ইবন খাত্তাবের ন্যায় অসম সাহসী বীর পুরুষ ইসলামে দাখিল হন। অতঃপর সর্বজনস্বীকৃত কুরাইশ সরদার হামযা মুসলিম হয়ে যান। ফলে কুরাইশ কাফেররা ভীতি প্রদর্শনের পথ পরিত্যাগ করে প্রলোভন ও প্ররোচনার মাধ্যমে ইসলামের অগ্রযাত্ৰা ব্যাহত করার কৌশল চিন্তা করতে শুরু করে। এমনি ধরনের এক ঘটনা হাফেয ইবন কাসীর মুসনাদে বাযযার, আবু ইয়ালা ও বগভী প্রমুখ বৰ্ণনা করেছেন।

ঘটনা হচ্ছে, কুরাইশ সরদার ওতবা ইবন রবীয়া একদিন একদল কুরাইশসহ মসজিদে হারামে উপবিষ্ট ছিল। অপরদিকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদের এক কোণে একাকী বসেছিলেন। ওতবা তার সঙ্গীদেরকে বলল, তোমরা যদি মত দাও, তবে আমি মুহাম্মদের সাথে কথাবার্তা বলি। আমি তার সামনে কিছু লোভনীয় বস্ত পেশ করব। যদি সে কবুল করে, তবে আমরা সেসব বস্তু তাকে দিয়ে দেব-যাতে সে আমাদের ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান থেকে নিবৃত হয়। এটা তখনকার ঘটনা, যখন  হামযা মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন এবং ইসলামের শক্তি দিন দিন বেড়ে চলছিল। ওতবার সঙ্গীরা সমস্বরে বলে উঠল, হে আবুল ওলীদ, (ওতবার ডাকনাম), আপনি অবশ্যই তার সাথে আলাপ করুন। ওতবা সেখান থেকে উঠে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেল এবং কথাবার্তা শুরু করল: প্রিয় ভ্রাতুস্পপুত্র। আপনি জানেন, কুরাইশ বংশে আপনার অসাধারণ মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে। আপনার বংশ সুদুর বিস্তৃত এবং আমরা সবাই আপনার কাছে সম্মানার্হ। কিন্তু আপনি জাতিকে এক গুরুতর সংকটে জড়িত করে দিয়েছেন। আপনার আনীত দাওয়াত জাতিকে বিভক্ত করে দিয়েছে, তাদেরকে বোকা ঠাওরিয়েছে, তাদের উপাস্য দেবতা ও ধর্মের গায়ে কলঙ্ক আরোপ করেছে এবং তাদের পূর্বপুরুষদেরকে কাফের আখ্যায়িত করেছে।

এখন আপনি আমার কথা শুনুন। আমি কয়েকটি বিষয় আপনার সামনে পেশ করছি, যাতে আপনি কোন একটি পছন্দ করে নেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবুল ওলীদ, বলুন, আপনি কি বলতে চান। আমি শুনব। আবুল ওলীদ বলল: ভ্রাতুস্পপুত্র! যদি আপনার পরিচালিত দাওয়াতের উদ্দেশ্য ধনসম্পদ অর্জন করা হয়, তবে আমরা ওয়াদা করছি, আপনাকে কুরাইশ গোত্রের সেরা বিত্তশালী করে দেব। আর যদি শাসনক্ষমতা অর্জন করা লক্ষ্য হয়, তবে আমরা আপনাকে কুরাইশের প্রধান সরদার মেনে নেব এবং আপনার আদেশ ব্যতীত কোন কাজ করব না। আপনি রাজত্ব চাইলে আমরা আপনাকে রাজারূপেও স্বীকৃতি দেব। পক্ষান্তরে যদি কোন জিন অথবা শয়তান আপনাকে দিয়ে এসব কাজ করায় বলে আপনি মনে করেন এবং আপনি সেটাকে বিতাড়িত করতে অক্ষম হয়ে থাকেন, তবে আমরা আপনার জন্যে চিকিৎসক ডেকে আনব, সে আপনাকে এই কষ্ট থেকে উদ্ধার করবে। এর যাবতীয় ব্যয়ভার আমরাই বহন করব। কেননা, আমরা জানি, মাঝে মাঝে জিন অথবা শয়তান মানুষকে কাবু করে ফেলে এবং চিকিৎসার ফলে তা সেরে যায়।

ওতবার এই দীর্ঘ বক্তৃতা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আবুল ওলীদ। আপনার বক্তব্য শেষ হয়েছে কি? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এবার আমার কথা শুনুন। সে বলল, অবশ্যই শুনব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পক্ষ থেকে কোন জওয়াব দেয়ার পরিবর্তে আলোচ্য সূরা ‘ফুসসিলাত’ তেলাওয়াত করতে শুরু করে দিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত করতে করতে যখন (فَإِنْ أَعْرَضُوا فَقُلْ أَنذَرْتُكُمْ صَاعِقَةً مِّثْلَ صَاعِقَةِ عَادٍ وَثَمُودَ) পর্যন্ত পৌছালেন, তখন ওতবা তাঁর মুখে হাত রেখে দিল এবং বংশ ও আত্মীয়তার কসম দিয়ে বলল, আমার প্রতি দয়া করুন, আর পাঠ করবেন না। অন্য বর্ণনায় এসেছে- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেলাওয়াত শুরু করলে ওতবা চুপচাপ শুনতে থাকে এবং হাতের পিঠ পিছনে লাগিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেজদার আয়াতে পৌছে সেজদা করলেন এবং ওতবাকে বললেনঃ আবুল ওলীদ! আপনি যা শুনবার শুনলেন। এখন আপনি যা ইচ্ছা করতে পারেন। ওতবা সেখান থেকে উঠে তার লোকজনের দিকে চলল। তারা দূর থেকে ওতবাকে দেখে পরস্পর বলতে লাগল, আল্লাহর কসম, আবুল ওলীদের মুখমন্ডল বিকৃত দেখা যাচ্ছে। সে যে মুখ নিয়ে এখান থেকে গিয়েছিল, সে মুখ আর নেই।

ওতবা মজলিসে পৌছলে সবাই বলল, বলুন, কি খবর আনলেন। ওতবা বলল, খবর এই: আল্লাহর কসম। আমি এমন কালাম শুনেছি, যা জীবনে কখনও শুনিনি। আল্লাহর কসম, সেটা জাদু নয়, কবিতা নয় এবং অতীন্দ্ৰিয়বাদীদের শয়তান থেকে অর্জিত কখনও নয়। হে কুরাইশ সম্প্রদায়, তোমরা আমার কথা মেনে নাও এবং ব্যাপারটি আমার কাছে সোপর্দ কর। আমার মতে তোমরা তার মোকাবেলা ও তাকে নির্যাতন করা থেকে সরে আস এবং তাকে তার কাজ করতে দাও। কেননা, তার এই কালামের এক বিশেষ পরিণতি প্ৰকাশ পাবেই। তোমরা এখন অপেক্ষা কর। অবশিষ্ট আরবদের আচরণ দেখে যাও। যদি তারাই কুরাইশের সহযোগিতা ব্যতীত তাকে পরাভূত করে ফেলে, তবে বিনা শ্রমেই তোমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে যাবে। আর সে যদি সবার উপর প্রবল হয়ে যায়, তবে তার রাজত্ব হবে তোমাদেরই রাজত্ব; তার ইযযত হবে তোমাদেরই ইযযত। তখন তোমরাই হবে তার সাফল্যের অংশীদার। তার সঙ্গীরা তার একথা শুনে বলল, আবুল ওলীদ, তোমাকে তো মুহাম্মদ কথা দিয়ে জাদু করেছে। ওতবা বলল, আমারও অভিমত তাই। এখন তোমাদের যা মন চায়, তাই কর। [মুসান্নাফে ইবন আবী শাইবাহ ১৪/২৯৫, মুসনাদে আবি ইয়া'লা, হাদীস নং ১৮১৮, মুস্তাদরাকে হাকিম ২/২৫৩, বাইহাকী, দালায়েল ২/২০২–২০৪]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪) সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে,[1] কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিমুখ হয়েছে। সুতরাং ওরা শোনে না। [2]

[1] ঈমানদার ও নেক আমলের অধিকারীদেরকে সফলতা ও জান্নাতের সুসংবাদদাতা এবং মুশরিক মিথ্যাজ্ঞানকারীদেরকে জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শনকারী।

[2] অর্থাৎ, চিন্তা-ভাবনা এবং জ্ঞান ও গবেষণার উদ্দেশ্যে শোনে না; যাতে তাদের উপকার হয়। এরই কারণে তাদের অধিকাংশরাই ছিল হিদায়াত থেকে বঞ্চিত।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৪১:৫ وَ قَالُوۡا قُلُوۡبُنَا فِیۡۤ اَکِنَّۃٍ مِّمَّا تَدۡعُوۡنَاۤ اِلَیۡہِ وَ فِیۡۤ اٰذَانِنَا وَقۡرٌ وَّ مِنۡۢ بَیۡنِنَا وَ بَیۡنِکَ حِجَابٌ فَاعۡمَلۡ اِنَّنَا عٰمِلُوۡنَ ؓ﴿۵﴾

আর তারা বলে, ‘তুমি আমাদেরকে যার প্রতি আহবান করছ সে বিষয়ে আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত, আমাদের কানের মধ্যে রয়েছে বধিরতা আর তোমার ও আমাদের মধ্যে রয়েছে অন্তরায়। অতএব তুমি (তোমার) কাজ কর, নিশ্চয় আমরা (আমাদের) কাজ করব। আল-বায়ান

তারা বলে, তুমি আমাদেরকে যার দিকে ডাক দিচ্ছ তাত্থেকে আমাদের দিল আবরণে ঢাকা আছে, আর আমাদের কানে আছে বধিরতা, আমাদের আর তোমাদের মাঝে আছে এক পর্দা (অর্থাৎ তোমার দীন প্রচারের কারণে আমাদের ও তোমাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে), কাজেই তুমি তোমার কাজ কর, আমরা আমাদের কাজ করি। তাইসিরুল

তারা বলেঃ তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহবান করছ সেই বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আচ্ছাদিত, কর্ণে আছে বধিরতা এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল; সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর এবং আমরা আমাদের কাজ করি। মুজিবুর রহমান

৫. আর তারা বলে, তুমি যার প্রতি আমাদেরকে ডাকছ সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ-আচ্ছাদিত, আমাদের কানে আছে বধিরতা এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে পর্দা; কাজেই তুমি তোমার কাজ কর, নিশ্চয় আমরা আমাদের কাজ করব।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৫) ওরা বলে, তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহবান করছ, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আচ্ছাদিত,[1] আমাদের কর্ণে আছে বধিরতা[2] এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে আছে অন্তরাল। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর এবং আমরা আমাদের কাজ করে যাই।[3]

[1] أَكِنَّة হল كِنَانٌ এর বহুবচন। এর অর্থঃ আবরণ, পর্দা, অর্থাৎ, আমাদের অন্তর আবৃত ও ঢাকা আছে। কাজেই আমরা তোমার তাওহীদ ও ঈমানের দাওয়াত বুঝতে পারি না।

[2] وَقْرٌ এর প্রকৃত অর্থ হল, (ভারী) বোঝা। এখানে বধিরতা বুঝানো হয়েছে, যা সত্য শোনার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে।

[3] অর্থাৎ, তোমার ও আমাদের মাঝে এমন অন্তরাল আছে যে, তুমি যা বল, তা শুনতে পাই না এবং তুমি যা কর, তা দেখতেও পাই না। কাজেই তুমি আমাদেরকে আমাদের নিজ অবস্থায় ছেড়ে দাও এবং আমরাও তোমাকে তোমার অবস্থায় ছেড়ে দিই। তুমি আমাদের ধর্মের উপর আমল করো না এবং আমরাও তোমার দ্বীনের উপর আমল করতে পারি না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৪১:৬ قُلۡ اِنَّمَاۤ اَنَا بَشَرٌ مِّثۡلُکُمۡ یُوۡحٰۤی اِلَیَّ اَنَّمَاۤ اِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ فَاسۡتَقِیۡمُوۡۤا اِلَیۡہِ وَ اسۡتَغۡفِرُوۡہُ ؕ وَ وَیۡلٌ لِّلۡمُشۡرِکِیۡنَ ۙ﴿۶﴾

বল, ‘আমি কেবল তোমাদের মত একজন মানুষ। আমার কাছে ওহী পাঠানো হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবলমাত্র এক ইলাহ। অতএব তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাক এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও’। আর মুশরিকদের জন্য ধ্বংস, আল-বায়ান

বল, আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। (পার্থক্য শুধু এই যে) আমার কাছে ওয়াহী করা হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবল এক ইলাহ; কাজেই তোমরা তাঁরই সরল সঠিক পথে চল, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। ধ্বংস তাদের জন্য যারা আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে শরীক গণ্য করে। তাইসিরুল

বলঃ আমিতো তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি অহী হয় যে, তোমাদের মা‘বূদ একমাত্র মা‘বূদ। অতএব তাঁরই পথ দৃঢ়ভাবে অবলম্বন কর এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। দুর্ভোগ অংশীবাদীদের জন্য – মুজিবুর রহমান

৬. বলুন, আমি কেবল তোমাদের মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহই কেবলমাত্র এক ইলাহ। অতএব তোমরা তার প্রতি দৃঢ়তা অবলম্বন কর এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্য—

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬) বল, আমি তো কেবল তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি (অহী) প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের উপাস্য (মাত্র) একমাত্র উপাস্য।[1] অতএব তাঁরই পথ অবলম্বন কর এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর দুর্ভোগ অংশীবাদীদের জন্য।

[1] অর্থাৎ, আমার ও তোমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই; কেবল অহী ছাড়া। অতএব এ দূরত্ব ও অন্তরায় কেন? তাছাড়া আমি যে তাওহীদের দাওয়াত পেশ করছি, সেটাও কোন এমন জিনিস নয় যে, তা তোমাদের বিবেক-বুদ্ধিতে আসবে না। তা সত্ত্বেও বিমুখতা কেন?

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৪১:৭ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَ ہُمۡ بِالۡاٰخِرَۃِ ہُمۡ کٰفِرُوۡنَ ﴿۷﴾

যারা যাকাত দেয় না। আর তারাই আখিরাতের অস্বীকারকারী। আল-বায়ান

যারা যাকাত দেয় না, আর তারা আখিরাত অমান্য করে। তাইসিরুল

যারা যাকাত প্রদান করেনা এবং তারা আখিরাতেও অবিশ্বাসী। মুজিবুর রহমান

৭. যারা যাকাত প্ৰদান করে না এবং তারাই আখিরাতের সাথে কুফরিকারী।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭) যারা যাকাত প্রদান করে না[1] এবং ওরা পরকালে অবিশ্বাসী।

[1] এটা হল মক্কী সূরা। যাকাত হিজরী ২য় সনে মদীনায় ফরয হয়। কাজেই এ থেকে হয় (সাধারণ) সাদাকা বুঝানো হয়েছে, যার নির্দেশ মক্কাতেই মুসলিমদেরকে দেওয়া হয়েছিল। যেমন, শুরুতে কেবল সকাল ও সন্ধ্যায় নামায পড়ার নির্দেশ ছিল। অতঃপর হিজরতের দেড় বছর পূর্বে পাঁচওয়াক্ত নামায পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অথবা যাকাতের ব্যাপক নির্দেশ মক্কায় ছিল। অতপর মদীনায় তার নিসাব ও পরিমাণ নির্ধারণ হয়। অথবা এখানে ‘যাকাত’ বলতে (আভিধানিক অর্থে পবিত্রতা) কালেমা শাহাদত বুঝানো হয়েছে, যার দ্বারা মানুষের অন্তর শিরকের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র হয়ে যায়। (ইবনে কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৪১:৮ اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَہُمۡ اَجۡرٌ غَیۡرُ مَمۡنُوۡنٍ ﴿۸﴾

নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে তাদের জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন প্রতিদান। আল-বায়ান

যারা ঈমান আনে আর নেক কাজ করে, তাদের জন্য আছে এমন পুরস্কার যা কোন দিনও বন্ধ হবে না। তাইসিরুল

যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার। মুজিবুর রহমান

৮. নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার।(১)

(১) মূল আয়াতে مَمْنُون কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। এ কথাটির আরো দুটি অর্থ আছে। একটি অর্থ হচ্ছে, তা হবে এমন পুরস্কার যা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে না বা সে জন্য খোঁটা দেয়া হবে না, যেমন কোন কৃপণ হিম্মত করে কোন কিছু দিলেও সে দানের কথা বার বার স্মরণ করিয়ে দেয়। আরেকটি অর্থ হচ্ছে, তা হবে এমন পুরস্কার যা কখনো হ্রাস পাবে না। উদ্দেশ্য এই যে, মুমিন ও সৎকর্মীদেরকে আখেরাতের স্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার দেয়া হবে। কোন কোন তফসীরবিদ এর অর্থ এই করেছেন যে, মুমিন ব্যক্তির অভ্যস্ত আমল কোন সময় কোন অসুস্থতা, সফর কিংবা অন্য কোন ওযরবশতঃ ছুটে গেলেও সে আমলের পুরস্কার ব্যাহত হয় না। বরং আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাগণকে আদেশ করেন, আমার বান্দা সুস্থ অবস্থায় অথবা অবসর সময়ে যে আমল নিয়মিত করত, তার ওযর অবস্থায় সে আমল না করা সত্বেও তার আমলনামায় তা লিখে দাও। এ বিষয়বস্তুর হাদীস সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে। [দেখুন: বুখারী ২৯৯৬]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করে এবং সৎকাজ করে তাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার রয়েছে। [1]

 [1] أَجْرٌ غَيْرُ مَمْنُوْنٍ এর অর্থ তা-ই, যে অর্থ হল, عَطَآءً غَيْرَ مَجْذوْذٍ এর। অর্থাৎ, অশেষ নেকী।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৪১:৯ قُلۡ اَئِنَّکُمۡ لَتَکۡفُرُوۡنَ بِالَّذِیۡ خَلَقَ الۡاَرۡضَ فِیۡ یَوۡمَیۡنِ وَ تَجۡعَلُوۡنَ لَہٗۤ اَنۡدَادًا ؕ ذٰلِکَ رَبُّ الۡعٰلَمِیۡنَ ۚ﴿۹﴾

বল, ‘তোমরা কি তাঁকে অস্বীকার করবে যিনি দু’দিনে যমীন সৃষ্টি করেছেন? আর তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ বানাতে চাচ্ছ? তিনিই সৃষ্টিকুলের রব’। আল-বায়ান

বল- তোমরা কি তাঁকে অস্বীকারই করছ যিনি যমীনকে সৃষ্টি করেছেন দু’দিনে আর তাঁর সমকক্ষ বানাচ্ছ? তিনিই তো বিশ্বজগতের রব্ব। তাইসিরুল

বলঃ তোমরা কি তাকে অস্বীকার করবেই যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুই দিনে এবং তোমরা তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করাতে চাও? তিনিতো জগতসমূহের রাব্ব। মুজিবুর রহমান

৯. বলুন, তোমরা কি তাঁর সাথেই কুফারী করবে। যিনি যমীন সৃষ্টি করেছেন(১) দু’দিনে এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ তৈরী করছ? তিনি সৃষ্টিকুলের রব্ব্‌!

(১) আলোচ্য আয়াতে মুশরিকদেরকে তাদের শিরক ও কুফরের কারণে এক সাবলীল ভঙ্গিতে হুশিয়ার করা উদ্দেশ্য। এতে আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টিগুণ তথা বিরাটকায় আকাশ ও পৃথিবীকে অসংখ্য রহস্যের উপর ভিত্তিশীল করে সৃষ্টি করার বিশদ বিবরণ দিয়ে তাদেরকে এই বলে শাসানো হয়েছে যে, তোমরা এমন নির্বোধ যে, মনে স্রষ্টা ও সর্বশক্তিমানের সাথেও অপরকে শরীক সাব্যস্ত কর? এমনি ধরনের হুশিয়ারী ও বিবরণ পবিত্র কুরআনের অন্যত্র এভাবে উল্লেখিত হয়েছে, (كَيْفَ تَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَكُنْتُمْ أَمْوَاتًا فَأَحْيَاكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ) [সূরা আল-বাকারাঃ ২৮]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) বল, তোমরা কি তাঁকে অস্বীকার করবেই যিনি দু’দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন[1] এবং তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করাবে? তিনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক।

[1] কুরআন কারীমের একাধিক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘‘আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন।’’ এখানে তার কিছু বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বলেছেন, পৃথিবীকে দু’দিনে বানিয়েছেন। আর এ থেকে রবি ও সোমবার বুঝানো হয়েছে। (তবে সে দিনের পরিমাণ কত, তা আল্লাহই ভালো জানেন।) সূরা নাযিআত (৩০নং আয়াতে) বলা হয়েছে, وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا এ থেকে বাহ্যিকভাবে বুঝা যায় যে, পৃথিবীকে আসমানের পর বানানো হয়েছে। অথচ এখানে পৃথিবী সৃষ্টির উল্লেখ আকাশ সৃষ্টির পূর্বে করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর ব্যাখ্যা এইভাবে করেছেন যে, সৃষ্টি করা এক জিনিস এবং دَحَى যার মূল হল, دَحْوٌ (বিস্তৃত করা বা বিছানো) আর এক জিনিস। অর্থাৎ, পৃথিবী সৃষ্টি আসমানের পূর্বে হয়েছে। যেমন, এখানেও বলা হয়েছে এবং دَحْوٌ অর্থাৎ, পৃথিবীকে বসবাসের যোগ্য বানানোর জন্য এর মধ্যে পানির ভান্ডার রাখা হয়, তাকে প্রয়োজনীয় জিনিস উৎপাদনের ক্ষেত্র বানানো হয়। اَخْرَجَ مِنْهَا مَآءَهَا وَمَرْعَاهَا এতে পাহাড়, নদ-নদী এবং নানা প্রকার ধাতু ও খনিজ পদার্থ রাখা হয়। এ সব কাজ সুসম্পন্ন হয় আকাশ সৃষ্টির পর অন্য দুই দিনে। এইভাবে পৃথিবী ও তার সংশ্লিষ্ট সমস্ত জিনিসের সৃষ্টি চার দিনে পরিপূর্ণ হয়। (বুখারীঃ তাফসীর সূরা হা-মীম সাজদাহ)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৪১:১০ وَ جَعَلَ فِیۡہَا رَوَاسِیَ مِنۡ فَوۡقِہَا وَ بٰرَکَ فِیۡہَا وَ قَدَّرَ فِیۡہَاۤ اَقۡوَاتَہَا فِیۡۤ اَرۡبَعَۃِ اَیَّامٍ ؕ سَوَآءً لِّلسَّآئِلِیۡنَ ﴿۱۰﴾

আর তার উপরিভাগে তিনি দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং তাতে বরকত দিয়েছেন, আর তাতে চারদিনে প্রার্থীদের জন্য সমভাবে খাদ্য নিরূপণ করে দিয়েছেন। আল-বায়ান

(যমীন সৃষ্টির পর) তার বুকে তিনি সৃদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, যমীনকে বরকতমন্ডিত করেছেন আর তাতে প্রার্থীদের প্রয়োজন মুতাবেক নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য সঞ্চিত করেছেন চার দিনে। তাইসিরুল

তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে রেখেছেন কল্যাণ এবং চার দিনে ব্যবস্থা করেছেন খাদ্যের - সমভাবে, যাঞ্চাকারীদের জন্য। মুজিবুর রহমান

১০. আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে(১) এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন সমভাবে যাচ্ঞাকারীদের জন্য।

(১) আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির বিষয় পবিত্র কুরআনে সংক্ষেপে ও বিস্তারিতভাবে বহু জায়গায় বিবৃত হয়েছে, কিন্তু কোনটির পরে কোনটি সৃজিত হয়েছে, এর উল্লেখ সম্ভবত: মাত্র তিন আয়াতে করা হয়েছে- (এক) হা-মীম সাজদার আলোচ্য আয়াত, (দুই) সূরা বাকারার ২৯ নং আয়াত (هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ) এবং (তিন) সূরা আন-নাযি’আতের নিম্নোক্ত আয়াতঃ (أَأَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ بَنَاهَا ٭ رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاهَا ٭ وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا وَأَخْرَجَ ضُحَاهَا ٭ وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَٰلِكَ دَحَاهَا ٭ أَخْرَجَ مِنْهَا مَاءَهَا وَمَرْعَاهَا ٭ وَالْجِبَالَ أَرْسَاهَا) বাহ্যদৃষ্টিতে এসব বিষয়বস্তুর মধ্যে কিছু বিরোধও দেখা যায়। কেননা, সূরা বাকারাহ ও সূরা হা-মীম সেজদার আয়াত থেকে জানা যায় যে, আকাশের পূর্বে পৃথিবী সৃজিত হয়েছে এবং সূরা আন-নাযি আতের আয়াত থেকে এর বিপরীতে জানা যায় যে, আকাশ সৃজিত হওয়ার পরে পৃথিবী সৃজিত হয়েছে।

সবগুলো আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে মনে হয় যে, প্রথমে পৃথিবীর উপকরণ সৃজিত হয়েছে। এমতাবস্থায়ই ধুম্রকুঞ্জের আকারে আকাশের উপকরণ নির্মিত হয়েছে। এরপর পৃথিবীকে বর্তমান আকারে বিস্তৃত করা হয়েছে এবং এতে পর্বতমালা, বৃক্ষ ইত্যাদি সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর আকাশের তরল ধূম্রকুঞ্জের উপকরণকে সপ্ত আকাশে পরিণত করা হয়েছে। আশা করি সবগুলো আয়াতই এই বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বাকী প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ্ তা'আলাই জানেন। সহীহ বুখারীতে এ আয়াতের অধীনে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে কতিপয় প্রশ্ন ও উত্তর বর্ণিত হয়েছে। তাতে ইবন আব্বাস এ আয়াতের উপযুক্তরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। [বুখারী কিতাবুত তাফসীর, বাব হা-মীম-আস-সাজদাহ]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার হাত ধরে বললেন, “আল্লাহ্ মাটি সৃষ্টি করেছেন শনিবার, আর তাতে পাহাড় সৃষ্টি করেছেন রবিবার, গাছ-গাছালি সোমবার, অপছন্দনীয় সবকিছু মঙ্গলবার, আলো সৃষ্টি করেছেন বুধবার, আর যমীনে জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন বৃহস্পতিবার। আর আদমকে শুক্রবার আছরের পরে সর্বশেষ সৃষ্টি হিসেবে দিনের সর্বশেষ প্রহরে আসর থেকে রাত পর্যন্ত সময়ে সৃষ্টি করেছেন।” [মুসলিম: ২৭৮৯] এই হিসাব মতে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সাত দিনে হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু কুরআনের আয়াত থেকে পরিস্কারভাবে জানা যায় যে, এই সৃষ্টিকাজ ছয় দিনে হয়েছে। এক আয়াতে আছেঃ “আমি আকাশ পৃথিবী ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি এবং আমাকে কোন ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।” [সূরা কাফ: ৩৮]

এ কারণে হাদীসবিদগণ উপরোক্ত বিশুদ্ধ বর্ণনাটির বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্ৰদান করেছেন। কেউ কেউ হাদীসটিকে অগ্রাহ্য বলে মনে করেছেন। আবার কেউ কেউ বর্ণনাটিকে কাব আহবারের উক্তি বলেও অভিহিত করেছেন। [ইবনে কাসীর] কিন্তু যেহেতু হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে, তাই এটাকে অগ্রাহ্য করার কোন সুযোগ নেই। আল্লামা মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দিন আল-আলবানী বলেন, এ হাদীসের সনদে কোন সমস্যা নেই। আর এ বর্ণনাটি কোনভাবেই কুরআনের বিরোধিতা করে না। যেমনটি কেউ কেউ মনে করে থাকে। কেননা, হাদীসটি শুধুমাত্র যমীন কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা বর্ণনা করে। আর তা ছিল সাতদিনে। আর কুরআনে এসেছে যে, আসমান ও যমীন সৃষ্টি হয়েছিল ছয় দিনে। আর যমীন সৃষ্টি হয়েছিল দুই দিনে। আসমান ও যমীন সৃষ্টির ছয়দিন এবং এ হাদীসে বর্ণিত সাতদিন ভিন্ন ভিন্ন সময় হতে পারে। আসমান ও যমীন ছয়দিনে সৃষ্টি হওয়ার পর যমীনকে আবার বসবাসের উপযোগী করার জন্য সাতদিন লেগেছিল। সুতরাং আয়াত ও সহীহ হাদীসের মধ্যে কোন বিরোধ নেই।

সারকথা এই যে, পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহকে একত্রিত করার ফলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিতরূপে জনা যায়, প্রথমত: আকাশ, পৃথিবী ও এতদূভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু মাত্র ছয় দিনে সৃজিত হয়েছে। সূরা হা-মীম সেজদার আয়াত থেকে দ্বিতীয়ত: জানা যায় যে, পৃথিবী, পর্বতমালা, বৃক্ষরাজি ইত্যাদি সৃষ্টিতে পূর্ণ চার দিন লেগেছে। তৃতীয়ত: জানা যায় যে, আকাশমন্ডলীর সৃজনে দুদিন লেগেছিল। চতুর্থত: আসমান, যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সৃষ্টির পর যমীনকে বসবাসের উপযোগী করতে সাতদিন লেগেছিল। এ সাতদিনের সর্বশেষ দিন শুক্রবারের কিছু অংশ বেঁচে গিয়েছিল, যাতে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছিল।

কোন কোন মুফাসসির উপরোক্ত হাদীস অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে আসমান ও যমীন সৃষ্টির ক্ষেত্রে শুধু কুরআনের ভাষ্যের উপর নির্ভর করেছেন। তাদের মতে, এসব আয়াতের বাহ্যিক অর্থ এই যে, আকাশ সৃষ্টির পরে পৃথিবীকে বিস্তৃত ও সম্পূর্ণ করা হয়েছে। তাই এটা অবান্তর নয় যে, পৃথিবী সৃষ্টির কাজ দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথম দু'দিনে পৃথিবী ও তার উপরিভাগের পর্বতমালা ইত্যাদির উপকরণ সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর দু’দিনে সপ্ত আকাশ সৃজিত হয়েছে। এরপর দু'দিনে পৃথিবীর বিস্তৃতি ও তৎমধ্যবর্তী পর্বতমালা, বৃক্ষরাজি, নদনদী, ঝর্ণা ইত্যাদির সৃষ্টি সম্পন্ন করা হয়েছে। এভাবে পৃথিবী সৃষ্টির চার দিন উপর্যুপরি রইল না। সূরা হা-মীম সেজদার আয়াতে প্রথমে (خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ) দুদিনে পৃথিবী সৃষ্টির কথা বলে মুশরিকদেরকে হুশিয়ার করা হয়েছে। অতঃপর আলাদা করে বলা হয়েছে- (وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِن فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ) “আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন”।

এতে তফসীরবিদগণ একমত যে, এই চার দিন প্রথমোক্ত দুদিনসহঃ পৃথক চার দিন নয়। নতুবা তা সর্বমোট আট দিন হয়ে যাবে, যা কুরআনের বর্ণনার বিপরীত। এখন চিন্তা করলে জানা যায় যে, (خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ) বলার পর যদি পবর্তমালা ইত্যাদির সৃষ্টিও দুদিনে বলা হত, তবে মোট চারদিন আপনা-আপনিই জানা যেত, কিন্তু পবিত্র কুরআন পৃথিবী সৃষ্টির অবশিষ্টাংশ উল্লেখ করে বলেছে, এ হল মোট চার দিন। এতে বাহ্যত: ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই চার দিন উপর্যুপরি ছিল না; বরং দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। দুদিন আকাশ সৃষ্টির পূর্বে এবং দুদিন তার পরে। আয়াতে (وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِنْ فَوْقِهَا) বাক্যে আকাশ সৃষ্টির পরবর্তী অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০) তিনি তাতে (পৃথিবীতে) অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন[1] এবং স্থাপন করেছেন কল্যাণ[2] এবং চার দিনের মধ্যে তাতে খাদ্যের[3] ব্যবস্থা করেছেন,[4] সমানভাবে সকল অনুসন্ধানীদের জন্য। [5]

[1] অর্থাৎ, পাহাড়গুলোকে পৃথিবী থেকেই সৃষ্টি করে তার উপর গেড়ে দেন যাতে পৃথিবী নড়া-চড়া না করে।

[2] অর্থাৎ, তাতে বরকত স্থাপন করেছেন। এ থেকে ইঙ্গিত করা হয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি, বহু প্রকারের খাদ্যসামগ্রী, খনিজ পদার্থ এবং এই ধরনের আরো অনেক প্রকারের আসবাব-পত্রের প্রতি, যা পৃথিবীর বরকত বা কল্যাণ। আর প্রভূত কল্যাণের নামই হল বরকত।

[3] أَقْوَاتٌ (খাদ্য, জীবিকা) হল قُوْتٌ এর বহুবচন। অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসবাসকারী সমস্ত সৃষ্টির খোরাক তাতে নির্ধারিত বা তার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর প্রতিপালকের এই নির্ধারণ বা ব্যবস্থাপনা এত বিস্তর ও ব্যাপক যে, কোন জিহ্বা তা বর্ণনা করতে পারবে না, কোন কলম তা লিপিবদ্ধ করতে পারবে না এবং কোন ক্যালকুলেটর তার হিসাব করতে পারবে না। কেউ কেউ নির্ধারিত করার অর্থ করেছেন, প্রত্যেক ভূখন্ডের জন্য পৃথক পৃথক ফল-ফসল নির্দিষ্ট করেছেন, যা অন্য অংশে তা উৎপন্ন হতে পারে না। যাতে প্রত্যেক অঞ্চলের বিশেষ এই উৎপন্ন দ্রব্য সেখানকার স্থানীয় লোকেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের বুনিয়াদ হয়ে যায় (এবং অন্য অঞ্চলের সাথে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সকলে লাভবান হয়। এ অর্থও সঠিক এবং একেবারে বাস্তব।

[4] অর্থাৎ, সৃষ্টির দু’দিন এবং বিস্তৃত করণের দু’দিন। সব দিনগুলো মিলিয়ে হল মোট চার দিন। যাতে এই সমস্ত কাজ সুসম্পন্ন হয়। (তবে সে দিন কত লম্বা তা আল্লাহই জানেন।)

[5] سَوَاءً এর অর্থ হল ঠিক বা পূর্ণ চার দিনে। অর্থাৎ, জিজ্ঞাসাকারীদের বলে দাও যে, সৃষ্টি ও বিস্তৃত করণের এ কাজ ঠিক বা পূর্ণ চার দিনে সম্পন্ন হয়। অথবা পূর্ণ কিংবা সঠিক উত্তর হল জিজ্ঞাসুদের জন্যে। অথবা খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, সমানভাবে সকল অভাবী ও অনুসন্ধানীদের জন্য।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৫৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 5 6 পরের পাতা »