মীযান বিষয়ক আয়াতসমূহ ৫ টি
আল-আ'রাফ
৭:৮ وَ الۡوَزۡنُ یَوۡمَئِذِ ۣالۡحَقُّ ۚ فَمَنۡ ثَقُلَتۡ مَوَازِیۡنُهٗ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ﴿۸﴾

আর সেদিন পরিমাপ হবে যথাযথ। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারি হবে তারাই হবে সফলকাম। আল-বায়ান

সেদিনের ওজন হবে ঠিক ঠিক। ফলে যাদের পাল্লা ভারী হবে তারা সফলকাম হবে। তাইসিরুল

আর সেদিন (কিয়ামাতের দিন) ন্যায় ও সঠিকভাবে (প্রত্যেকের ‘আমল) ওযন করা হবে, সুতরাং যাদের (পুণ্যের) পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে কৃতকার্য ও সফলকাম। মুজিবুর রহমান

And the weighing [of deeds] that Day will be the truth. So those whose scales are heavy - it is they who will be the successful. Sahih International

৮. আর সেদিন ওজন(১) যথাযথ হবে।(২) সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে।(৩)

(১) সেদিনের সে দাঁড়িপাল্লায় কোন অপরাধীর অপরাধ বাড়িয়ে দেয়া হবে না। আর কোন নেককারের নেক কমিয়ে দেয়া হবে না। [আদওয়াউল বায়ান] অন্য আয়াতেও আল্লাহ সেটা বলেছেন, “আর কেয়ামতের দিনে আমরা ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব, সুতরাং কারো প্রতি কোন যুলুম করা হবে না এবং কাজ যদি শস্য দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও তা আমরা উপস্থিত করব।” [সূরা আল-আম্বিয়া: ৪৭] তবে আল্লাহ তা'আলা কোন কোন নেক বান্দার আমলকে বহুগুণ বর্ধিত করবেন। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করেন না। আর কোন পুণ্য কাজ হলে আল্লাহ সেটাকে বহুগুণ বর্ধিত করেন এবং আল্লাহ তার কাছ থেকে মহাপুরস্কার প্রদান করেন।” [সূরা আন-নিসা: ৪০] অনুরূপভাবে ‘হাদীসে বিতাকাহ’ নামে বিখ্যাত হাদীসেও [দেখুন, ইবন মাজাহঃ ৪৩০০; তিরমিযী ২১২৭] সেটা বর্ণিত হয়েছে।

(২) এ আয়াতে বলা হয়েছেঃ “সেদিন যে ভাল-মন্দ কাজকর্মের ওজন হবে তা সত্য সঠিকভাবেই হবে।” এতে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই। এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এতে মানুষ ধোঁকায় পড়তে পারে যে, যেসব বস্তু ভারী, সেগুলোর ওজন ও পরিমান হতে পারে। মানুষের ভাল-মন্দ কাজকর্ম কোন জড় পদার্থ নয় যে, এগুলোকে ওজন করা যেতে পারে। এমতাবস্থায় কাজকর্মের ওজন কিরূপে করা হবে? উত্তর এই যে, প্রথমতঃ আল্লাহ্ তা'আলা সর্বশক্তিমান। তিনি সব কিছুই করতে পারেন। অতএব, আমরা যা ওজন করতে পারি না আল্লাহ্ তা'আলাও তা ওজন করতে পারবেন, এটা বিচিত্র কিছু নয়। দ্বিতীয়তঃ আজকাল জগতে ওজন প্রায়োজন নেই।

এসব নবাবিস্কৃত যন্ত্রের সাহায্যে আজকাল এমন বস্তুও ওজন করা যায়, যা ইতোপূর্বে ওজন করার কল্পনাও করা যেত না। আজকাল বাতাসের চাপ এবং বৈদ্যুতিক প্রবাহও ওজন করা যায়। এমনকি শীত-গ্রীষ্ম পর্যন্ত ওজন করা হয়। এগুলোর মিটারই এদের দাড়িপাল্লা। যদি আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অসীম শক্তি-বলে মানুষের কাজকর্ম ওজন করে নেন, তবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। হাদীসে রয়েছে যে, যদি কোন বান্দার ফরয কাজসমূহে কোন ক্রটি পাওয়া যায়, তবে রাব্বুল আলামীন বলবেনঃ দেখ, তার নফল কাজও আছে কি না। নফল কাজ থাকলে ফরযের ক্রটি নফল দ্বারা পূরণ করা হবে। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/৬৫]

আমলের ওজন পদ্ধতিঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কিয়ামতের দিন কিছু মোটাআ লোক আসবে। তাদের মূল্য আল্লাহ্‌র কাছে মশার পাখার সমানও হবে না। এ কথার সমর্থনে কুরআনুল কারীমের এ আয়াত পাঠ করলেন। (فَلَا نُقِيمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَزْنًا) অর্থাৎ কেয়ামতের দিন আমি তাদের কোন ওজন স্থির করবো না। [বুখারীঃ ৪৪৫২, মুসলিমঃ ২৭৮৫] আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রশংসায় বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তার পা দু’টি বাহ্যতঃ যতই সরু হোক, যার হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম, কেয়ামতের দাড়িপাল্লায় তার ওজন ওহুদ পর্বতের চাইতেও বেশী হবে। [মুসনাদে আহমাদ: ১/৪২০]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, দুটি বাক্য উচ্চারণের দিক দিয়ে খুবই হালকা; কিন্তু দাঁড়িপাল্লায় অত্যন্ত ভারী এবং আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। বাক্য দুটি হচ্ছে, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’, ‘সুবহানাল্লাহিল আযীম’। [বুখারীঃ ৭৫৬৩]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ ‘সুবহানাল্লাহ’ বললে আমলের দাড়িপাল্লার অর্ধেক ভরে যায় আর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে বাকী অর্ধেক পূর্ণ হয়ে যায়। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/২৬০, ৫/৩৬৫; সুনান দারমীঃ ৬৫৩] অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘আমলের ওজনের বেলায় কোন আমলই সচ্চরিত্রতার সমান ভারী হবে না’। [আবু দাউদঃ ৪৭৯৯; তিরমিযীঃ ২০০৩] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি জানাযার সাথে কবরস্থান পর্যন্ত যায়, তার আমলের ওজনে দুটি কিরাত রেখে দেয়া হবে। [বুখারীঃ ১২৬১]। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, এই কিরাতের ওজন হবে ওহুদ পাহাড়ের সমান। [মুসলিমঃ ৬৫৪] কেয়ামতে আমলের ওজন সম্পর্কে এ ধরণের বহু হাদীস রয়েছে।

(৩) মানুষের জীবনের সমগ্র কার্যাবলী দুটি অংশে বিভক্ত হবে। একটি ইতিবাচক বা সৎকাজ এবং অন্যটি নেতিবাচক বা অসৎকাজ। ইতিবাচক অংশের অন্তর্ভুক্ত হবে সত্যকে জানা ও মেনে নেয়া এবং সত্যের অনুসরণ করে সত্যের খাতিরে কাজ করা। আখেরাতে এটিই হবে ওজনদার, ভারী ও মূল্যবান। আর সে মূল্যবান কাজের ফলাফলও মূল্যবান হবে। এ আয়াতে তা উল্লেখ না হলেও অন্য আয়াতে সেটা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “অতঃপর যার পাল্লাসমূহ ভারী হবে, সে তো থাকবে সন্তোষজনক জীবনে।” [সূরা আল-কারি'আহ: ৬–৭] অর্থাৎ জান্নাতে।

অন্যদিকে সত্য থেকে গাফিল হয়ে অথবা সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে মানুষ নিজের নফস-প্রবৃত্তি বা অন্য মানুষের ও শয়তানের অনুসরণ করে অসত্য পথে যা কিছুই করে, তা সবই নেতিবাচক অংশে স্থান লাভ করবে। আর এ নেতিবাচক অংশটি কেবল যে মূল্যহীন হবে তাই নয়, বরং এটি মানুষের ইতিবাচক অংশের মর্যাদাও কমিয়ে দেবে। কাজেই মানুষের জীবনের সমুদয় কার্যাবলীর ভাল অংশ যদি তার মন্দ অংশের ওপর বিজয় লাভ করে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে অনেক কিছু দেবার পরও তার হিসেবে কিছু না কিছু অবশিষ্ট থাকে, তবেই আখেরাতে তার সাফল্য লাভ করা সম্ভব।

তাফসীরে জাকারিয়া

(৮) সেদিন ওজন ঠিকভাবেই করা হবে, যাদের ওজন ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আ'রাফ
৭:৯ وَ مَنۡ خَفَّتۡ مَوَازِیۡنُهٗ فَاُولٰٓئِكَ الَّذِیۡنَ خَسِرُوۡۤا اَنۡفُسَهُمۡ بِمَا كَانُوۡا بِاٰیٰتِنَا یَظۡلِمُوۡنَ ﴿۹﴾

আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই হবে সেই সব লোক, যারা নিজদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি (অস্বীকার করার মাধ্যমে) যুলম করত। আল-বায়ান

যাদের পাল্লা হালকা হবে তারা হল যারা নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, কারণ তারা আমার নিদর্শনসমূহকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাইসিরুল

আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারা হবে সেই সব লোক যারা নিজেদের ধ্বংস ও ক্ষতি নিজেরাই করেছে। কেননা তারা আমার নিদর্শনসমূহকে (আয়াত) প্রত্যাখ্যান করত। মুজিবুর রহমান

And those whose scales are light - they are the ones who will lose themselves for what injustice they were doing toward Our verses. Sahih International

৯. আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই সে সব লোক, যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে(১), যেহেতু তারা আমাদের আয়াতসমূহের প্রতি যুলুম করত।

(১) এখানে ক্ষতি বলতে কি তা বলা হয়নি। অন্য আয়াতে সেটা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “আর যার পাল্লাসমূহ হালকা হবে, তার স্থান হবে ‘হা-ওয়িয়াহ’, আর আপনাকে কিসে জানাবে সেটা কী? অত্যন্ত উত্তপ্ত আগুন।” [সূরা আল-কারি'আহ: ৮–১১] আরও বলেন, “আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে; তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে। আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে এবং তারা সেখানে থাকবে বীভৎস চেহারায়। [সূরা আল-মুমিনুন: ১০৩–১০৪]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৯) আর যাদের ওজন হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে, যেহেতু তারা আমার নিদর্শনাবলীকে প্রত্যাখ্যান করত। [1]

[1] এই আয়াতসমূহে আমলসমূহ ওজন করার বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। আর এটা হবে কিয়ামতের দিন। কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে এবং বহু হাদীসেও এ কথা আলোচিত হয়েছে। যার অর্থ হল, ওজন করার যন্ত্র (দাঁড়িপাল্লা) দ্বারা আমলসমূহ ওজন করা হবে। সুতরাং যার নেকীর পাল্লা ভারী হবে, সে সফলকাম হবে। আর যার পাপের পাল্লা ভারী হবে, সে হবে অসফল। কিন্তু আমলসমূহ তো বিমূর্ত অশরীরী বস্তু যার বাহ্যিক কোন আকার ও ওজন নেই, অতএব তা কিভাবে ওজন করা হবে? এ ব্যাপারে একটি মত হল, মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন সেগুলোকে বাহ্যিক রূপ দান করবেন, অতঃপর সেগুলোর ওজন হবে। দ্বিতীয় মত হল, যে দপ্তর ও খাতাসমূহে আমলসমূহ লিপিবদ্ধ করা হয়, সেগুলোকে ওজন করা হবে। তৃতীয় মত হল, স্বয়ং আমলকারীকে ওজন করা হবে। এই তিনটি মত পোষণকারীদের কাছে স্ব স্ব মতের সমর্থনে অনেক সহীহ হাদীস ও আষার (সাহাবীদের উক্তিসমূহ) বিদ্যমান রয়েছে। এই জন্যই ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, তিনটি মতই সঠিক হতে পারে। হতে পারে কখনো আমল, কখনো আমলনামা এবং কখনো আমলকারীকে ওজন করা হবে। (দলীলের জন্য দ্রষ্টব্যঃ তাফসীর ইবনে কাসীর) যাই হোক, দাঁড়িপাল্লা ও আমল ওজন করার ব্যাপারটা কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এটা অস্বীকার অথবা তার অপব্যাখ্যা করা ভ্রষ্টতা। আর বর্তমানে তো এটাকে অস্বীকার করার মোটেই কোন অবকাশ নেই। কেননা, এখন তো ওজন হয় না, এমন জিনিসও ওজন করা হচ্ছে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২১ আল-আম্বিয়া
২১:৪৭ وَ نَضَعُ الۡمَوَازِیۡنَ الۡقِسۡطَ لِیَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ فَلَا تُظۡلَمُ نَفۡسٌ شَیۡئًا ؕ وَ اِنۡ كَانَ مِثۡقَالَ حَبَّۃٍ مِّنۡ خَرۡدَلٍ اَتَیۡنَا بِهَا ؕ وَ كَفٰی بِنَا حٰسِبِیۡنَ ﴿۴۷﴾

আর কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। কারো কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা হাযির করব। আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট। আল-বায়ান

আর কিয়ামাত দিবসে আমি সুবিচারের মানদন্ড স্থাপন করব, অতঃপর কারো প্রতি এতটুকুও অন্যায় করা হবে না। (কর্ম) সরিষার দানা পরিমাণ হলেও তা আমি হাযির করব, হিসাব গ্রহণে আমিই যথেষ্ট। তাইসিরুল

এবং কিয়ামাত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায়বিচারের মানদন্ড। সুতরাং কারও প্রতি কোন অবিচার করা হবেনা এবং কাজ যদি সরিষার দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তাও আমি উপস্থিত করব। হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট। মুজিবুর রহমান

And We place the scales of justice for the Day of Resurrection, so no soul will be treated unjustly at all. And if there is [even] the weight of a mustard seed, We will bring it forth. And sufficient are We as accountant. Sahih International

৪৭. আর কেয়ামতের দিনে আমরা ন্যায়বিচারের পাল্লাসমূহ স্থাপন করব(১), সুতরাং কারো প্রতি কোন যুলুম করা হবে না এবং কাজ যদি শষ্য দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও তা আমরা উপস্থিত করব; আর হিসেব গ্রহণকারীরূপে আমরাই যথেষ্ট।

(১) লক্ষণীয় যে, এখানে مَوَازِين শব্দটি ميزان শব্দের বহুবচন। [কুরতুবী] অর্থ ওজনের যন্ত্র তথা দাঁড়িপাল্লা। আয়াতের অর্থ, দাঁড়িপাল্লাসমূহ স্থাপন করা হবে। এখন প্রশ্ন হলো, মানদন্ড কি একটি না বহু? এখানে আয়াতে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে দেখে কোন কোন তফসীরবিদ বলেন যে, আমল ওজন করার জন্য অনেকগুলো দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে। আমলের শ্রেণী অনুসারে অনেক দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে অথবা, প্ৰত্যেকের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন দাঁড়িপাল্লা হবে। আবার এটাও হতে পারে যে, একই মীযানকে বহু হিসেবে দেখানো হয়েছে। [কুরতুবী]

কিন্তু অধিকাংশ আলেমগণের মতে, দাঁড়িপাল্লা একটিই হবে। যার থাকবে দু'টি পাল্লা। যে দু'টি পাল্লা সবাই দেখতে পাবে, অনুভব করতে পারবে। তবে বহুবচনে ব্যক্ত করার কারণ হয়ত এটাই যে, মীযানের পাল্লাতে যেমনিভাবে বান্দার আমলনামা ওজন করা হবে তেমনিভাবে বান্দার আমলকেও সরাসরি ওজন করা হবে এমনকি বান্দাকেও ওজন করা হবে। সে হিসেবে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। [শারহুত তাহাভীয়্যাহ]

বান্দার আমলনামা ওজন করা হবে তার প্রমাণঃ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ আমার উম্মতের মধ্যে একলোককে কেয়ামতের দিন সমস্ত সৃষ্টির সামনে পৃথক করে একান্তে ডেকে তার জন্য ৯৯ টি দপ্তর বের করবেন যার প্রত্যেকটি চোখ যতদুর যায় তত লম্বা হবে। তারপর তাকে বলবেনঃ “তুমি কি এগুলো অস্বীকার কর? আমার রক্ষণাবেক্ষণকারী লেখক ফেরেশতাগণ কি তোমার উপর অত্যাচার করেছে? সে বলবেঃ না, হে প্ৰভু! তারপর আল্লাহ বলবেনঃ তোমার কি কোন ওজর বা সৎকর্ম আছে? লোকটি তখন হতভম্ব হয়ে গিয়ে বলবেঃ না, হে প্ৰভু! তখন আল্লাহ বলবেনঃ অবশ্যই তোমার একটি সৎকর্ম আছে, তোমার উপর আজ কোন যুলুম করা হবে না।

তারপর তার জন্য একটি কার্ড বের করা হবে যাতে আছেঃ اَشْهَدُ اَنْ لاَّ اِلَهَ اِلاَّ اللهُ وَاَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه وَرَسُوْلُه “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন হক্ক ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।” তারপর আল্লাহ বলবেনঃ সেটা নিয়ে আস। তখন লোকটি বলবেঃ হে প্ৰভু! ঐ সমস্ত দপ্তরের বিপরীতে এ কার্ড কি ভূমিকা রাখতে পারে? তখন আল্লাহ্ বলবেনঃ তোমার উপর যুলুম করা হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর সে সমস্ত দপ্তর এক পাল্লায় এবং কার্ডটি আরেক পাল্লায় রাখা হবে। রাসূল বললেনঃ আর তাতেই সমস্ত দপ্তর উপরে উঠে যাবে এবং কার্ডটি ভারী হয়ে যাবে। আল্লাহর নামের বিপরীতে কোন কিছু ভারী হতে পারে না।” [তিরমিযীঃ ২৬৩৯, ইবনে মাজাহঃ ৪৩০০] এ হাদীস দ্বারা বোঝা যাচ্ছে যে, বান্দার আমলনামা ওজন করা হবে।

বান্দার আমলই সরাসরি ওজন করার প্রমাণঃ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “দুটি বাক্য এমন যা দয়াময়ের কাছে প্রিয়, জিহ্বার উপর হাল্কা, মীযানের মধ্যে ভারী, আর তা হলোঃ সুবাহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি (আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি তাঁর প্রশংসা সহকারে), সুবহানাল্লাহিল আজীম (মহান আল্লাহ কতই না পবিত্র)। [বুখারীঃ ৭৫৬৩, মুসলিমঃ ২৬৯৪]

স্বয়ং আমলকারীকেও ওজন করা হবেঃ তার স্বপক্ষে প্রমাণ আল্লাহর বাণীঃ “সুতরাং আমরা তাদের জন্য কিয়ামতের দিন কোন ওজন স্থির করব না”। [সূরা আল-কাহাফঃ ১০৫] অন্য এক হাদীসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু ‘আরাক’ গাছে উঠলেন, তিনি ছিলেন সরু গোড়ালী বিশিষ্ট মানুষ, ফলে বাতাস তাকে নাড়াচ্ছিল তাতে উপস্থিত লোকেরা হেসে উঠল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেনঃ “তোমরা হাসছ কেন?” তারা বললঃ হে আল্লাহর নবী! তার সরু গোড়ালীর কারণে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, এ দু'টি মীযানের উপর উহুদ পাহাড়ের চেয়েও বেশী ভারী”। [মুসনাদে আহমাদঃ ১/৪২০–৪২১, মুস্তাদরাক ৩/৩১৭]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪৭) কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায় বিচারের দাঁড়িপাল্লাসমূহ; সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণ ওজনের হয়, তবুও তা আমি উপস্থিত করব। আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট। [1]

[1] مَوَازِين শব্দটি مِيزان এর বহুবচন। এর অর্থঃ দাঁড়িপাল্লাসমূহ। কিয়ামতের দিন পাপ-পুণ্য ওজন করার জন্য কয়েকটি দাঁড়িপাল্লা হবে, নতুবা দাঁড়িপাল্লা তো একটিই হবে, তবে ওর বিশেষ মহত্তের জন্য বা বিভিন্ন ধরনের আমলের দিকে লক্ষ্য রেখে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষের আমল ও কর্মসমূহ অতীন্দ্রীয়, তা ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য ও অনুভূত নয়, তার বাহ্যিক কোন রূপ বা অস্তিতত্ত্ব নেই, তাহলে তার ওজন কিভাবে সম্ভব? আধুনিক যুগে এই প্রশ্নের কোন গুরুত্ব নেই। যেহেতু বর্তমানে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এ প্রশ্নের উত্তর সহজ করে দিয়েছে। বর্তমানে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্যে নিরাকার তথা ওজনহীন বস্তুও ওজন করা যাচ্ছে। যখন মানুষের দ্বারা এটা সম্ভব তখন মহান আল্লাহর জন্য আকারহীন বা ওজনহীন অশরীরী জিনিসকে ওজন করা কেমন করে কঠিন হতে পারে? তাঁর মহিমা হল, তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। এ ছাড়া এও হতে পারে যে, (ন্যায়-বিচার করতে) মানুষকে দেখানোর জন্য তিনি নিরাকার বস্তুকে সাকার বানাবেন এবং তা ওজন করবেন। যেমন হাদীসসমূহে কিছু কর্মের সাকার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণ সবরূপঃ কিয়ামতের দিন কুরআন এক ফ্যাকাসে বর্ণের শীর্ণ পুরুষের বেশে কুরআন তেলাঅতকারীর সামনে উপস্থিত হবে। সে জিজ্ঞেস করবে, ‘তুমি কে?’ সে বলবে, ‘আমি কুরআন যা তুমি রাত্রি জাগরণ করে পাঠ করতে ও দিনে পিপাসার্ত অবস্থায় পাঠ করতে।’ (আহমাদ ৫/৩৪৮, ৩৫২, ইবনে মাজাহ) অনুরূপভাবে মুমিনের কবরে তার সৎকর্ম এক সুন্দর সুরভিত যুবকের রূপ ধরে আসবে এবং কাফের ও মুনাফিকদের কাছে এর বিপরীত রূপ নিয়ে। (আহমাদ ৫/২৮৭) এর বিস্তারিত ব্যখ্যা জানার জন্য দেখুন সূরা আ’রাফের ৯নং আয়াতের টীকা।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩ আল-মুমিনুন
২৩:১০২ فَمَنۡ ثَقُلَتۡ مَوَازِیۡنُهٗ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ﴿۱۰۲﴾

অতঃপর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম। আল-বায়ান

যাদের (সৎ কাজের) পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম। তাইসিরুল

সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম। মুজিবুর রহমান

And those whose scales are heavy [with good deeds] - it is they who are the successful. Sahih International

১০২. অতঃপর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম,

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০২) সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে সফলকাম।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
২৩ আল-মুমিনুন
২৩:১০৩ وَ مَنۡ خَفَّتۡ مَوَازِیۡنُهٗ فَاُولٰٓئِكَ الَّذِیۡنَ خَسِرُوۡۤا اَنۡفُسَهُمۡ فِیۡ جَهَنَّمَ خٰلِدُوۡنَ ﴿۱۰۳﴾ۚ

আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজদের ক্ষতি করল; জাহান্নামে তারা হবে স্থায়ী। আল-বায়ান

যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই ওরা যারা নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে, জাহান্নামে তারা চিরস্থায়ী হবে। তাইসিরুল

আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে; তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে। মুজিবুর রহমান

But those whose scales are light - those are the ones who have lost their souls, [being] in Hell, abiding eternally. Sahih International

১০৩. আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে; তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০৩) আর যাদের পাল্লা হাল্কা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে; তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ৫ পর্যন্ত, সর্বমোট ৫ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে