আল্লাহ কারো অংশীদারিত্ব (শিরক) থেকে পবিত্র বিষয়ক আয়াতসমূহ ৮২ টি
আল-বাকারা
২:১১৬ وَ قَالُوا اتَّخَذَ اللّٰہُ وَلَدًا ۙ سُبۡحٰنَہٗ ؕ بَلۡ لَّہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ کُلٌّ لَّہٗ قٰنِتُوۡنَ ﴿۱۱۶﴾

আর তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তিনি পবিত্র মহান; বরং আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তা তাঁরই । সব তাঁরই অনুগত। আল-বায়ান

তারা বলে যে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন, তিনি অতি পবিত্র, বরং যা কিছু আকাশসমূহে এবং ভূ-মন্ডলে আছে সমস্তই তাঁর, সকলই তাঁর অনুগত। তাইসিরুল

এবং তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তিনি পরম পবিত্র! বরং যা কিছু আসমানে ও ভূমন্ডলে রয়েছে তা তাঁরই জন্য; সবই তাঁর আজ্ঞাধীন। মুজিবুর রহমান

১১৬. আর তারা বলে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন’। তিনি (তা থেকে) অতি পবিত্র।(১) বরং আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর। সবকিছু তারই একান্ত অনুগত।

(১) নাসারারা বলে থাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সন্তান গ্রহণ করেছেন। অথচ এটা সম্পূর্ণ একটি অপবাদ। কুরআনের অন্যত্র এসেছে, তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের শোভন নয়! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না। [সূরা মারইয়ামঃ ৯১-৯৩] এ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ বলেন, মানুষ আমার উপর মিথ্যারোপ করে, অথচ তাদের এটা উচিত নয়। মানুষ আমাকে গালি দেয়, অথচ তাও তাদের জন্য উচিত নয়। মিথ্যারোপ করার অর্থ হলো, তারা বলে, আমি তাদের মৃত্যুর পর জীবিত করে পূর্বের ন্যায় করতে সক্ষম নই। আর গালি দেয়ার অর্থ হলো, তারা বলে যে, আমার পুত্র আছে। অথচ স্ত্রী বা সন্তান গ্রহণ করা থেকে আমি পবিত্র।” [বুখারীঃ ৪৪৮২] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, “কষ্টদায়ক কথা শুনার পর আল্লাহর চেয়ে বেশী ধৈর্যশীল আর কেউ নেই, মানুষ তার জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে, তারপরও তিনি তাদেরকে নিরাপদে রাখেন ও রিযিক দেন।” [বুখারী: ৭৩৭৮, মুসলিম: ২৮০৪]

তাফসীরে জাকারিয়া

১১৬। তারা বলে, ‘আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।’ তিনি (আল্লাহ) মহান পবিত্র। বরং আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই। সবকিছু তাঁরই একান্ত অনুগত।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আলে-ইমরান
৩:৬৪ قُلۡ یٰۤاَہۡلَ الۡکِتٰبِ تَعَالَوۡا اِلٰی کَلِمَۃٍ سَوَآءٍۢ بَیۡنَنَا وَ بَیۡنَکُمۡ اَلَّا نَعۡبُدَ اِلَّا اللّٰہَ وَ لَا نُشۡرِکَ بِہٖ شَیۡئًا وَّ لَا یَتَّخِذَ بَعۡضُنَا بَعۡضًا اَرۡبَابًا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَقُوۡلُوا اشۡہَدُوۡا بِاَنَّا مُسۡلِمُوۡنَ ﴿۶۴﴾

বল, ‘হে কিতাবীগণ, তোমরা এমন কথার দিকে আস, যেটি আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি। আর তার সাথে কোন কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ ছাড়া রব হিসাবে গ্রহণ না করি’। তারপর যদি তারা বিমুখ হয় তবে বল, ‘তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম’। আল-বায়ান

বল, ‘হে আহলে কিতাব! এমন এক কথার দিকে আসো, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, তা এই যে, আমরা আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো ‘ইবাদাত করব না এবং কোন কিছুকে তাঁর শরীক করব না এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাদের মধ্যে কেউ কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ করব না। তারপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলে দাও, তোমরা এ বিষয়ে সাক্ষী থাক যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী। তাইসিরুল

তুমি বলঃ হে আহলে কিতাব! আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে যে বাক্যে সুসাদৃশ্য রয়েছে তার দিকে এসো, যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারও ইবাদাত না করি এবং তাঁর সাথে কোন অংশী স্থির না করি এবং আল্লাহকে পরিত্যাগ করে আমরা পরস্পর কেহকে রাব্ব রূপে গ্রহণ না করি। অতঃপর যদি তারা ফিরে যায় তাহলে বলঃ সাক্ষী থেকো যে, আমরা মুসলিম (আল্লাহর নিকট আত্মসমপর্নকারী)। মুজিবুর রহমান

৬৪. আপনি বলুন, হে আহলে কিতাবগণ! এস সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত না করি, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ আল্লাহ ছাড়া একে অন্যকে রব হিসেবে গ্রহণ না করি। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তোমরা বল, তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম।(১)

(১) এ আয়াত থেকে দ্বীনের প্রতি আমন্ত্রণ জানানোর একটি মূলনীতি জানা যায়। তা এই যে, ভিন্ন মতাবলম্বী কোন দলকে দ্বীনের প্রতি আমন্ত্রণ জানাতে হলে প্রথমে তাকে শুধু এমন বিষয়ের প্রতিই আহবান জানানো উচিত, যে বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রোম সম্রাটকে ইসলামের দাওয়াত দেন, তখন এমন বিষয়ের প্রতি আহবান জানান, যাতে উভয়েই একমত ছিলেন। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলার একত্ববাদ। আমন্ত্রণ লিপিতে লিখা হয়েছিলঃ আমি আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি- যিনি পরম করুণাময় ও দয়ালু। এ পত্র আল্লাহর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি। যে হেদায়াতের পথ অনুসরণ করে, তার প্রতি শাস্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। মুসলিম হয়ে যান; শান্তি লাভ করবেন। আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন। আর যদি বিমুখ হন, তবে আপনার প্রজা সাধারণের গোনাহ আপনার উপর পতিত হবে। “হে আহলে কিতাবগণ! এমন এক বিষয়ের দিকে আস, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে অভিন্ন। তা এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত করব না। তার সাথে অংশীদার করব না এবং আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে পালনকর্তা সাব্যস্ত করব না।” [বুখারীঃ ৭]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৬৪) তুমি বল, ‘হে আহলে কিতাব (ধর্মগ্রন্থধারি)গণ! এস সে বাক্যের প্রতি যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে অভিন্ন; (তা এই যে,) আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করব না, কোন কিছুকেই তার অংশী করব না[1] এবং আমাদের কিছু লোক আল্লাহকে ছেড়ে অপর কিছু লোককে প্রভুরূপে গ্রহণ করবে না।’[2] অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে বল, ‘তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমরা আত্ম-সমর্পণকারী (মুসলিম)।’ [3]

[1] না কোন মূর্তিকে, না ক্রুশকে, না আগুনকে এবং না অন্য কোন কিছুকে। বরং কেবলমাত্র এক আল্লাহরই ইবাদত করব। আর এটাই ছিল প্রত্যেক নবীর দাওয়াত।

[2] প্রথম যে জিনিসটির প্রতি এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে তা হল, তোমরা ঈসা এবং উযায়ের (আলাইহিমাস্ সালাম)-এর রব্ব বা প্রতিপালক হওয়ার যে মনগড়া বিশ্বাস রাখ, তা সম্পূর্ণ ভুল। তাঁরা রব্ব ছিলেন না, বরং মানুষ ছিলেন। আর দ্বিতীয় যে জিনিসটির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা হল, তোমরা যে তোমাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদেরকে হালাল ও হারাম করার অধিকার দিয়ে রেখেছ, তা তাদেরকে রব্ব মনে করারই অন্তর্ভুক্ত। যেমন, [اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ] আয়াতও এ কথার সাক্ষ্য দেয়। তাদের এ কাজও সঠিক নয়। কারণ, হালাল ও হারাম করার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। (ইবনে কাসীর ও ফাতহুল ক্বাদীর)

[3] বুখারী শরীফের বর্ণনায় এসেছে যে, কুরআন কারীমের এই নির্দেশ অনুযায়ী রসূল (সাঃ) রোমক বাদশাহ হিরাকলের নিকটে পত্র প্রেরণ করেন এবং পত্রের মাধ্যমে এই আয়াতের দাবী অনুযায়ী তাকে ইসলাম কবুল করার প্রতি আহবান জানান।

« فَأَسْلِمْ تَسْلَمْ، أَسلِمْ يُؤْتِكَ اللهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ فَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَإِنَّ عَلَيْكَ إِثْمَ الْأَرِيسِيِّينَ» ‘‘ইসলাম কবুল করে নাও, নিরাপত্তা পাবে। মুসলিম হয়ে যাও, তাহলে মহান আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ নেকী দিবেন। কিন্তু যদি তুমি ইসলাম স্বীকার না কর, তাহলে প্রজাদের পাপও তোমার উপর চাপবে।’’ (বুখারী ৭নং) কেননা, প্রজাদের ইসলাম স্বীকার না করার কারণই হবে তুমি। আলোচ্য আয়াতে তিনটি মৌলিক বিষয় উল্লিখিত হয়েছে, (ক) কেবলমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করা, (খ) তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা এবং (গ) কাউকে শরীয়তী বিধান প্রণয়নের ইলাহী মর্যাদা না দেওয়া। এটাই সেই ‘অভিন্ন বাক্য’ যার উপর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রতি আহলে-কিতাবদেরকে আহবান জানানো হয়েছে। সুতরাং এই শতধা-বিচ্ছিন্ন উম্মতকেও ঐক্যবদ্ধ করতে উক্ত তিনটি বিষয়কে এবং এই ‘অভিন্ন বাক্য’কে অধিকরূপে মূল ভিত্তি ও বুনিয়াদ হিসাবে গ্রহণ করা উচিত।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:৩৬ وَ اعۡبُدُوا اللّٰہَ وَ لَا تُشۡرِکُوۡا بِہٖ شَیۡئًا وَّ بِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا وَّ بِذِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡیَتٰمٰی وَ الۡمَسٰکِیۡنِ وَ الۡجَارِ ذِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡجَارِ الۡجُنُبِ وَ الصَّاحِبِ بِالۡجَنۡۢبِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ۙ وَ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ مَنۡ کَانَ مُخۡتَالًا فَخُوۡرَا ﴿ۙ۳۶﴾

তোমরা ইবাদাত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকট আত্মীয়ের সাথে, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট আত্মীয়- প্রতিবেশী, অনাত্মীয়- প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী। আল-বায়ান

তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর, কিছুকেই তাঁর শরীক করো না এবং মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের আয়ত্তাধীন দাস-দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ লোককে ভালবাসেন না, যে অহংকারী, দাম্ভিক। তাইসিরুল

এবং তোমরা আল্লাহরই ইবাদাত কর এবং তাঁর সাথে কোন বিষয়ে অংশী স্থাপন করনা; এবং মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, দরিদ্র, সম্পর্কবিহীন প্রতিবেশী, পার্শ্ববতী সহচর ও পথিক এবং তোমাদের দাস-দাসীদের সাথেও সদ্ব্যবহার কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী আত্মাভিমানীকে ভালবাসেননা। মুজিবুর রহমান

৩৬. আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর ও কোন কিছুকে তার শরীক করো না(১); এবং পিতা-মাতা(২), আত্মীয়-স্বজন(৩), ইয়াতীম, অভাবগ্রস্থ(৪), নিকট প্রতিবেশী(৫), দুর-প্রতিবেশী(৬), সঙ্গী-সাথী(৭), মুসাফির(৮) ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের(৯) প্রতি সদ্ব্যবহারকরো নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক, অহংকারীকে।(১০)

(১) অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদাত কর এবং ইবাদাতের বেলায় তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করো না। মু'আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে তার বাহনে বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় তিনি বললেন, তুমি কি জান, বান্দার উপর আল্লাহর কি হক? আমি বললামঃ আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ বান্দার উপর আল্লাহর হক হল, একমাত্র তারই ইবাদাত করা। তার সাথে অন্য কাউকে শরীক না করা। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো অনেক পথ চলার পর আবার বললেনঃ হে মুআয ইবন জাবাল! তুমি কি জান, বান্দা যদি এ কাজটি করে তাহলে আল্লাহর উপর বান্দার কি হক রয়েছে? আমি বললামঃ আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ আল্লাহর উপর বান্দার হক হল, তাদেরকে শাস্তি না দেয়া। [বুখারীঃ ৬৫০০]


(২) আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তাওহীদের পর সমস্ত আপনজন-আত্মীয় ও সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পিতা-মাতার অধিকার সর্বাগ্রে। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় ইবাদাত বন্দেগী ও হকসমূহের পর পরই পিতা-মাতার হক সম্পর্কিত বিবরণ দানের মাধ্যমে ইঙ্গিত করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে সমস্ত নেয়ামত ও অনুগ্রহ একান্তই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে, কিন্তু বাহ্যিক উপকরণের দিক দিয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহর পরে মানুষের প্রতি সর্বাধিক ইহসান বা অনুগ্রহ থাকে পিতা-মাতার। সাধারণ উপকরণসমূহের মাঝে মানুষের অস্তিত্বের পিছনে পিতা-মাতাই বাহ্যিক কারণ। তাছাড়া জন্ম থেকে যৌবন প্রাপ্তি পর্যন্ত যে সমস্ত কঠিন ও বন্ধুর পথ ও স্তর রয়েছে, পিতা-মাতাই তাকে সেগুলোতে সাহায্য করেন এবং তার প্রতিপালন ও পরিবর্ধনের জামানতদার হয়ে থাকেন। সে জন্যই আল্লাহ্ তা'আলা অন্যান্য জায়গায়ও পিতামাতার হকসমূহকে তার ইবাদাত ও আনুগত্যের সাথে যুক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ “আমার এবং তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর”। [সূরা লুকমান: ১৪] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীসমূহে যেমন পিতা-মাতার আনুগত্য এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাকিদ রয়েছে, তেমনিভাবে তার সীমাহীন ফযীলত, মর্তব্য ও সওয়াবের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত রয়েছে।” [তিরমিযী: ১৮৯৯]


(৩) এখানে সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করার তাকিদ দেয়া হয়েছে। কুরআনুল কারীমের প্রসিদ্ধ এক আয়াতে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়শঃই বিভিন্ন ভাষণের পর তেলাওয়াত করতেন। তা হলো, “আল্লাহ সবার সাথে ন্যায় ও সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছেন এবং নির্দেশ দিচ্ছেন আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করার জন্য”। [সূরা আন-নাহ্‌ল: ৯০] এতে সামর্থ্যানুযায়ী আত্মীয়-আপনজনদের কায়িক ও আর্থিক সেবা-যত্ন করা, তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা এবং তাদের খবরা-খবর নেয়াও অন্তর্ভুক্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সদকার মাল সাধারণ গরীব-মিসকীনকে দান করলে তাতে তো শুধু সদকার সওয়াবই পাওয়া যায়, অথচ তা যদি নিজের রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়-আপনজনকে দান করা হয়, তাহলে তাতে দুটি সওয়াব পাওয়া যায়। একটি হল সদকার সওয়াব এবং আরেকটি হল সেলায়ে-রেহমীর সওয়াব। [মুসনাদে আহমাদ ৪/২১৪, নাসায়ী: ২৫৮২] অর্থাৎ আত্মীয়তার হক আদায় করার সওয়াব।


(৪) অর্থাৎ লাওয়ারিশ তথা অনাথ শিশু এবং অসহায় মানুষের সাহায্য-সহযোগিতাও এমনি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী বিবেচনা করবে, যেমন আত্মীয়-আপনজনদের বেলায় করে থাক।


(৫) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে আবু যর, যখন তরকারী রান্না করবে তখন তাতে বেশী পরিমাণে পানি দিও এবং এর দ্বারা তোমার পড়শীর খোজখবর নিও। [মুসলিমঃ ২৬২৫] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখে সে যেন তার পড়শীর সম্মান করে, তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপর ঈমান আনে সে যেন তার মেহমানের পুরস্কার দিয়ে তাকে সম্মানিত করে। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, মেহমানের পুরস্কার কি? তিনি বললেন, একদিন ও রাত্রি। আর মেহমান তিন দিন এর পরের যা সময় তাতে ব্যয় করা সদকাস্বরূপ। তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও শেষ দিনে উপর ঈমান আনে সে যেন ভাল বলে অথবা চুপ থাকে। [বুখারী: ৬০১৯] অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম সংগী হচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সংগীগণ। আর আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম পড়শী হচ্ছেন ঐ পড়শী, যে তার পড়শীর জন্য উত্তম। [তিরমিযী: ১৯৪৪]


(৬) এ আয়াতে দু'রকমের প্রতিবেশীর কথা বলা হয়েছে। এ উভয় প্রকার প্রতিবেশীর বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ جَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ বলতে সেসব প্রতিবেশীকে বোঝায়, যারা প্রতিবেশী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়ও বটে। এভাবে এতে দু’টি হক সমন্বিত হয়ে যায়। আর وَالْجَارِ الْجُنُبِ বলতে শুধু সে প্রতিবেশীকে বোঝায় যার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। আর সে জন্যই তার উল্লেখ করা হয়েছে দ্বিতীয় পর্যায়ে। [তাবারী] কোন কোন মনীষী বলেছেন, ‘জারে-যিলকোরবা’ এমন প্রতিবেশীকে বলা হয়, যে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত এবং মুসলিম। আর ‘জারে-জুনুব’ বলা হয় অমুসলিম প্রতিবেশীকে। কুরআনে ব্যবহৃত শব্দে অবশ্য এ সমুদয় সম্ভাব্যতাই বিদ্যমান। অবশ্য প্রতিবেশী হওয়া ছাড়াও যার অন্যান্য হক রয়েছে, অন্যান্য প্রতিবেশীদের তুলনায় তাকে মর্যাদাগত অগ্রাধিকার দিতে হবে।


(৭) যদিও এর শাব্দিক অর্থ হল সহকর্মী। এতে সেসব সফর সঙ্গীরাও অন্তর্ভুক্ত যারা রেল, জাহাজ, বাস, মোটর প্রভৃতিতে পাশাপাশি বসে ভ্রমণ করে এবং সে সমস্ত লোকও অন্তর্ভুক্ত যারা কোন সাধারণ বা বিশেষ বৈঠক বা অধিবেশনে আপনার সাথে উপবেশন করে থাকে। ইসলামী শরীআত নিকটবর্তী ও দূরবর্তী স্থায়ী প্রতিবেশীদের অধিকার সংরক্ষণকে যেমন ওয়াজিব করে দিয়েছে, তেমনিভাবে সে ব্যক্তির সাহচর্যের অধিকার বা হককেও অপরিহার্য করে দিয়েছে, যে সামান্য সময়ের জন্য হলেও কোন মজলিস, বৈঠক অথবা সফরের সময় আপনার সমপর্যায়ে উপবেশন করে। তাদের মধ্যে মুসলিম, অমুসলিম, আত্মীয়, অনাত্মীয় সবাই সমান - সবার সাথেই সদ্ব্যবহার করার হেদায়াত করা হয়েছে। এর সর্বনিম্ন পর্যায় হচ্ছে এই যে, আপনার কোন কথায় বা কাজে যেন সে কোন রকম কষ্ট না পায়।

এমন কোন কথা বলবেন না, যাতে সে মৰ্মাহত হতে পারে। এমন কোন আচরণ করবেন না, যাতে তার কষ্ট হতে পারে। যেমন, ধুমপান করে তার দিকে ধোয়া ছাড়া, পান খেয়ে তার দিকে পিক ফেলা এবং এমনভাবে বসা যাতে তার বসার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায় প্রভৃতি। যানবাহনে অন্য কোন যাত্রী পাশে বসতে গেলে এ কথা ভাবা উচিত যে, এখানে তার ততটুকুই অধিকার রয়েছে যতটা রয়েছে আমার। কোন কোন তাফসীরকার বলেছেন, এমন প্রতিটি লোকই ‘সাহেবে-বিল-জাম্ব’-এর অন্তর্ভুক্ত যে কোন কাজে, কোন পেশায় বা কোন বিষয়ে আপনার সাথে জড়িত বা আপনার অংশীদার; তা শিল্প-শ্রমেই হোক অথবা অফিস-আদালতের চাকরিতেই হোক অথবা কোন সফরে বা স্থায়ী বসবাসেই হোক। [রুহুল মা'আনী]


(৮) আয়াতে এমন লোককে বোঝানো হয়েছে যে সফরের অবস্থায় আপনার নিকট এসে উপস্থিত হয় কিংবা আপনার মেহমান হয়ে যায়। যেহেতু এই অজানা-অচেনা লোকটির কোন আত্মীয় বা সম্পৰ্কীয় লোক এখানে উপস্থিত থাকে না, সেহেতু কুরআন ইসলামী তথা মানবীয় সম্পর্কের প্রেক্ষিতে তার হকও আপনার উপর অপরিহার্য বলে সাব্যস্ত করে দিয়েছে। তা হল, সামর্থ্য ও সাধ্যানুযায়ী তার সাথে সদ্ব্যবহার করা।


(৯) এতে অধিকারভুক্ত দাস-দাসীকে বোঝানো হয়েছে। তাদের ব্যাপারেও এ হক সাব্যস্ত ও অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে যে, তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। সাধ্যানুযায়ী তাদের খাওয়া পরার ব্যাপারে কার্পণ্য করবে না। তাছাড়া তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কোন কাজ তাদের দ্বারা করাবে না। এখানে আয়াতের বাক্যগুলো যদিও সরাসরিভাবে অধিকারভুক্ত দাস-দাসীকেই বোঝাচ্ছে, কিন্তু কারণ-উপকরণের সামঞ্জস্য এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন বক্তব্যের ভিত্তিতে আলোচ্য নির্দেশ ও বিধি-বিধান দাস-দাসী, চাকর-চাকরানী ও অন্যান্য কর্মচারীর ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। তাদের হকও একই রকম। নির্ধারিত বেতন-ভাতা, খানাপিনা প্রভৃতির ব্যাপারে কার্পণ্য বা বিলম্ব করা যাবে না এবং তাদের উপর সাধ্যাতীত কোন কাজও চাপানো যাবে না। যদি শরীআত মত তাদেরকে পরিচালনা করা হয় তবে তাদের যাবতীয় খরচও সদকার অন্তর্ভুক্ত ৷ এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি নিজে যা খাও তা তোমার জন্য সদকা এবং যা তোমার ছেলেকে খাওয়াও তাও তোমার জন্য সদকা, যা তোমার স্ত্রীকে খাওয়াও তাও তোমার জন্য সদকা। অনুরূপভাবে যা তোমার খাদেমকে খাওয়াও সেটাও তোমার জন্য সদকা হিসাবে গণ্য হবে। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/১৩১]

অপর বর্ণনায় এসেছে, মা’রূর ইবন সায়ীদ বলেন, আমি আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহুর গায়ে একটি চাদর দেখলাম, অনুরূপ আরেকটি চাদর তার দাসের গায়ে দেখলাম। এ ব্যাপারে আমরা আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, একদিন এক লোককে গালি দিয়েছিলাম। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ দিলে রাসূল আমাকে বললেন, তুমি কি তাকে তার মায়ের ব্যাপার উল্লেখ করে অপমান করলে? তারপর তিনি বললেন, “এরা তোমাদের ভাই, তোমাদের অনুগামী। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে তোমাদের কর্তৃত্বাধীন করেছেন। অতএব যার কোন ভাই তার কর্তৃত্বাধীন থাকে, তবে সে যা খায় তা থেকে যেন তাকে খাওয়ায়, যা পরিধান করে তা থেকে যেন তাকে পরিধান করায়। তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কোন দায়িত্ব তাদেরকে দিবে না, যদি সাধ্যের অতিরিক্ত কোন দায়িত্ব দাও তবে তাদেরকে সাহায্য কর।” [বুখারী: ২৫৪৫; মুসলিম: ১৬৬২]


(১০) আল্লাহ এমন লোককে পছন্দ করেন না, যে দাম্ভিক এবং নিজেকে অন্যের চাইতে বড় প্রতিপন্ন করে। আয়াতের এই শেষ বাক্যটি পূর্ববর্তী সমস্ত বক্তব্যের উপসংহার। কারণ, পূর্ববর্তী আটটি পর্যায়ে যে সমস্ত লোকের হক সম্পর্কে তাকীদ করা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে সে সমস্ত লোকই শৈথিল্য প্রদর্শন করে যাদের মন-মানসিকতায় আত্মগৰ্ব, অহমিকা, তাকাব্বুর ও দাম্ভিকতা বিদ্যমান। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীকে ওসীয়ত করে বলেছেনঃ কাউকে গালি দিও না। সাহাবী বললেনঃ এরপর আমি কোন স্বাধীন, দাস, উট বা ছাগল কাউকেই গালি দেইনি। তিনি আরো বললেনঃ সামান্য কোন নেক কাজকেও হেয় করে দেখবে না যদিও তোমার কোন ভাইয়ের সাথে হাসি মুখে কথা বলা হোক। আর তোমার কাপড়কে টাখনুর অর্ধেক পর্যন্ত উঠাবে, যদি তা করতে না চাও তবে দুই গিরা পর্যন্ত নামাতে পার। কাপড়কে ‘ইসবাল’ বা গিরার নীচে পরা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ কর। কেননা, এটাই অহংকারের চিহ্ন। আল্লাহ তা'আলা অহংকারীকে পছন্দ করেন না। যদি কোন লোক তোমাকে গালি দেয় অথবা তোমার কোন ক্রটি জানতে পেরে তা নিয়ে উপহাস করে, তুমি তার সেরকম কিছু জেনেও তাকে উপহাস করো না। কারণ, এর প্রতিফল তাকেই ভোগ করতে হবে। [আবু দাউদঃ ৪০৮৪, তিরমিযীঃ ২৭২২]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩৬) তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও কোন কিছুকে তাঁর অংশী করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, [1] সঙ্গী-সাথী,[2] পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের[3] প্রতি সদ্ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ আত্মম্ভরী দাম্ভিককে ভালবাসেন না। [4]

 [1] الْجَارِ الْجُنُبِ (অনাত্মীয় প্রতিবেশী) আত্মীয় প্রতিবেশীর বিপরীতার্থক শব্দ হিসাবে ব্যবহার হয়েছে। এর অর্থ হল, এমন প্রতিবেশী যার সাথে আত্মীয়তার কোন সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, প্রতিবেশীর সাথে প্রতিবেশী হওয়ার কারণে উত্তম ব্যবহার করো। তাতে সে আত্মীয় হোক অথবা না হোক। অনুরূপ হাদীসেও এর প্রতি বড়ই তাকীদ করা হয়েছে।

[2] এ থেকে সফর-সঙ্গী, সহকর্মী, স্ত্রী এবং এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে কোন লাভের আশায় কারো সাথে নৈকট্য ও ওঠা-বসার সম্পর্ক গড়ে তোলে। বরং এর আওতায় এমন লোকও আসতে পারে, যারা জ্ঞানচর্চা এবং কোন কাজ শেখার জন্য অথবা কোন ব্যবসা বা পেশার খাতিরে আপনার কাছে ওঠা-বসার সুযোগ লাভ করেছে। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[3] এতে ঘরের দাস-দাসী, ভৃত্য-চাকর, দোকানের এবং কারখানা ও মিলের কর্মচারীরাও এসে যায়। ক্রীতদাস-দাসীদের সাথে সদ্ব্যবহার করার বড়ই তাকীদ অনেক হাদীস এসেছে।

[4] দাম্ভিকতা ও অহংকারকে মহান আল্লাহ চরম ঘৃণা করেন। এমন কি একটি হাদীসে এসেছে যে, ‘‘এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে।’’ (মুসলিম ৯১নং) এখানে বিশেষ করে অহংকারের নিন্দা করার উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তাআলার ইবাদত এবং যাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার তাকীদ করা হয়েছে, এর উপর আমল কেবল সেই ব্যক্তির পক্ষে করা সম্ভব, যার অন্তর অহংকার থেকে খালি। দাম্ভিক প্রকৃতার্থে না ইবাদতের হক আদায় করতে পারবে, না আপনজন ও অপরজনদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে পারবে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:৪৮ اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَ یَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدِ افۡتَرٰۤی اِثۡمًا عَظِیۡمًا ﴿۴۸﴾

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। আল-বায়ান

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন এবং যে আল্লাহর সাথে শরীক করল, সে এক মহা অপবাদ আরোপ করল। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী স্থাপনকারীকে ক্ষমা করবেননা এবং তদ্ব্যতীত যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন এবং যে কেহ আল্লাহর অংশী স্থির করে সে মহাপাপে আবদ্ধ হল। মুজিবুর রহমান

৪৮. নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শরীক(১) করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন(২)। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রটনা করে।

(১) আয়াতে আল্লাহ তা'আলার সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে যেসব বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে, যে কোন সৃষ্ট বস্তুর ব্যাপারে তেমন কোন বিশ্বাস পোষণ করাই হল শির্ক। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোন সৃষ্ট বস্তুকে ইবাদাত কিংবা মহব্বত ও সম্মান প্রদর্শনে আল্লাহর সমতুল্য মনে করাই শির্ক। জাহান্নামে পৌছে মুশরিকরা যে উক্তি করবে, আল্লাহ তা'আলা তা উল্লেখ করেছেন যে, “আল্লাহর শপথ, আমরা প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত ছিলাম যখন আমরা তোমাদেরকে বিশ্ব-পালনকর্তার সমতুল্য স্থির করেছিলাম।” [সূরা আশ-শু'আরাঃ ৯৭-৯৮] শির্কের প্রকারভেদ সম্পর্কে সূরা আল-বাকারাহ এর ২২ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখানে এটা জানা আবশ্যক যে, যুলুম ও অবিচার তিন প্রকার। এক প্রকার যুলুম যা আল্লাহ্ তাআলা কখনো ক্ষমা করবেন না। দ্বিতীয় প্রকার যুলুম যা মাফ হতে পারে। আর তৃতীয় প্রকার যুলুমের প্রতিশোধ আল্লাহ তা'আলা না নিয়ে ছাড়বেন না। প্রথম প্রকার যুলুম হচ্ছে শির্ক, দ্বিতীয় প্রকার আল্লাহর হকে ক্রটি করা এবং তৃতীয় প্রকার বান্দার হক বিনষ্ট করা। [ইবন কাসীর]

এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, তিনি তার সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করবেন না। এর বাইরে যত গোনাহ আছে সবই তিনি যার জন্যে ইচ্ছে ক্ষমা করে দিবেন। আর যে তার সাথে কাউকে শরীক করে সে অবশ্যই এক বড় মিথ্যা অপবাদ রটনা করল। অন্য আয়াতে অবশ্য আল্লাহ্ তা'আলা শির্ককারীদের মধ্যে যারা তাওবা করবে তাদেরকে ক্ষমা করার কথা ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, “আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহকে ডাকে না, ... তবে যদি তারা তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে।” [সূরা আল-ফুরকান: ৭০] সুতরাং তাওবাহ করলে শির্কও মাফ হয়ে যায়।


(২) আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ আমরা কবীরা গোনাহকারীর জন্য ইস্তেগফার করা থেকে বিরত থাকতাম। শেষ পর্যন্ত যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ আয়াত শুনলাম এবং আরো শুনলাম যে, তিনি বলছেনঃ আমি আমার দো’আকে গচ্ছিত রেখেছি আমার উম্মতের কবীরা গোনাহগারদের সুপারিশ করার জন্য। ইবন উমর বলেনঃ এরপর আমাদের অন্তরে যা ছিল, তা অনেকটা কেটে গেল ফলে আমরা ইস্তেগফার করতে থাকলাম ও আশা করতে থাকলাম। [মুসনাদে আবি ইয়া'লাঃ ৫৮১৩]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৪৮) নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শিরক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। [1] আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শিরক) করে, সে এক মহাপাপ করে। [2]

[1] অর্থাৎ, এমন অপরাধ ও গুনাহ, যা থেকে তওবা না করেই মুমিন মারা গেছে। আল্লাহ তাআলা কারো জন্য চাইলে কোন প্রকারের শাস্তি না দিয়েই তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং অনেককে শাস্তি দেওয়ার পর ক্ষমা করবেন। আবার অনেককে নবী করীম (সাঃ)-এর সুপারিশে ক্ষমা করবেন। কিন্তু আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করার অপরাধ কোন অবস্থাতেই মাফ হবে না। কেননা, মুশরিকের উপর তিনি জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন।

[2] অন্যত্র বলেছেন, [إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ] "শিরক হল সব চেয়ে বড় অন্যায়।" (লুকমানঃ ১৩) হাদীসেও শিরককে সব থেকে বড় পাপ গণ্য করা হয়েছে। أَكْبَرُ الْكَبَائِرِ الشِّرْكُ بِاللهِ ...।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আন-নিসা
৪:১১৬ اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَ یَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا ﴿۱۱۶﴾

নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে তো ঘোর পথভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হল। আল-বায়ান

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না, এছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে, সে চরমভাবে গোমরাহীতে পতিত হল। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী স্থাপনকারীকে ক্ষমা করেননা এবং এতদ্ব্যতীত তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে থাকেন; এবং যে আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন করে সে নিশ্চয়ই সুদূর বিপথে বিভ্রান্ত হয়েছে। মুজিবুর রহমান

১১৬. নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করেন না; আর তার থেকে ছোট যাবতীয় গোনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন, আর যে কেউ আল্লাহ্‌র সাথে শির্ক করে সে ভীষণভাবে পথ ভ্রষ্ট হয়।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১১৬) নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শিরক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শিরক) করে, সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:১৭ لَقَدۡ کَفَرَ الَّذِیۡنَ قَالُوۡۤا اِنَّ اللّٰہَ ہُوَ الۡمَسِیۡحُ ابۡنُ مَرۡیَمَ ؕ قُلۡ فَمَنۡ یَّمۡلِکُ مِنَ اللّٰہِ شَیۡئًا اِنۡ اَرَادَ اَنۡ یُّہۡلِکَ الۡمَسِیۡحَ ابۡنَ مَرۡیَمَ وَ اُمَّہٗ وَ مَنۡ فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا ؕ وَ لِلّٰہِ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ مَا بَیۡنَہُمَا ؕ یَخۡلُقُ مَا یَشَآءُ ؕ وَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۱۷﴾

অবশ্যই তারা কুফরী করেছে যারা বলে ‘নিশ্চয় মারইয়াম পুত্র মাসীহই আল্লাহ’। বল, যদি আল্লাহ ধ্বংস করতে চান মারইয়াম পুত্র মাসীহকে ও তার মাকে এবং যমীনে যারা আছে তাদের সকলকে ‘তাহলে কে আল্লাহর বিপক্ষে কোন কিছুর ক্ষমতা রাখে? আর আসমানসমূহ, যমীন ও তাদের মধ্যবর্তী যা রয়েছে, তার রাজত্ব আল্লাহর জন্যই। তিনি যা ইচ্ছা তা সৃষ্টি করেন এবং আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল-বায়ান

তারা কুফরী করেছে যারা বলে মাসীহ্ ইবনে মারইয়ামই আল্লাহ। বল, মাসীহ ইবনে মারইয়াম, আর তার মা এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলকে ধ্বংস করতে চাইলে আল্লাহর বিরুদ্ধে কারো এতটুকু ক্ষমতা আছে কি? আসমানসমূহে আর পৃথিবীতে ও এদের মধ্যে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই মালিকানাধীন। তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন। আল্লাহ্ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই তারা কাফির যারা বলেঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ স্বয়ং হচ্ছেন মসীহ্ (ঈসা) ইবনে মারইয়াম! তুমি বলঃ যদি আল্লাহ মসীহ্ (ঈসা) ইবনু মারইয়ামকে ও তার মাতাকে এবং ভূ-পৃষ্ঠে যারা আছে তাদের সবাইকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন তাহলে এরূপ কে আছে যে তাদেরকে আল্লাহ হতে এতটুকু রক্ষা করতে পারে? আল্লাহরই কর্তৃত্ব নির্দিষ্ট রয়েছে আকাশসমূহে ও যমীনে এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত যাবতীয় কিছুর উপর; তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই সৃষ্টি করেন, আর আল্লাহ সকল বস্তুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। মুজিবুর রহমান

১৭. যারা বলে, নিশ্চয় মারইয়াম-তনয় মসীহই আল্লাহ্‌, তারা অবশ্যই কুফরী করেছে।(১) বলুন, আল্লাহ যদি মারইয়াম-তনয় মসীহ, তার মাতা এবং দুনিয়ার সকলকে ধ্বংস করতে ইচ্ছে করেন তবে তাঁকে বাধা দেবার শক্তি কার আছে? আর আসমানসমূহ ও যমীনে এবং এ দুয়ের মধ্যে যা কিছু আছে তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন(২) এবং আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

(১) আলোচ্য আয়াতে নাসারাদের একটি উক্তির খণ্ডন করা হয়েছে- যা তাদের একদলের বিশ্বাসও ছিল। অর্থাৎ তাদের একদলের বিশ্বাস ছিল যে, ঈসা মসীহ হুবহু আল্লাহ। কিন্তু আয়াতে যে যুক্তি দ্বারা বিষয়টির খণ্ডন করা হয়েছে, তাতে নাসারাদের সব দলের একত্ববাদ বিরোধী ভ্রান্ত বিশ্বাসেরই খণ্ডন হয়ে যায়, তা মসীহ আলাইহিস সালামের আল্লাহর সন্তান হওয়া সংক্রান্ত বিশ্বাসই হোক অথবা তিন ইলাহর অন্যতম ইলাহ হওয়ার বিশ্বাসই হোক। আল্লাহ তা’আলা বলছেন যে, যদি তিনি ঈসা ও তার মা মারইয়ামকে মারতে ইচ্ছা করেন, তবে কি এমন কেউ আছে যে তাদেরকে মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারে?

তারা নিজেরাও সেটা করতে সক্ষম নয়। সুতরাং তারা কিভাবে ইলাহ হতে পারে? আল্লাহ তা'আলার সামনে মসীহ 'আলাইহিস সালাম এতই অক্ষম যে, তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেন না এবং যে জননীর খেদমত ও হেফাযত তার কাছে প্রাণের চেয়েও প্রিয়, সে জননীকেও রক্ষা করতে পারেন না। সুতরাং তিনিই কিভাবে ইলাহ হতে পারেন। আর তার মা যেহেতু মারা গেছেন সেহেতু কিভাবেই বা তিনি তিন ইলাহর অন্যতম ইলাহ বলে বিবেচিত হবেন? [তাফসীর মুয়াসসার ও সা’দী]


(২) ‘তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন’ এ বাক্যে নাসারাদের পূর্বোক্ত ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণকে খণ্ডন করা হয়েছে। কেননা, মসীহকে আল্লাহ মনে করার আসল কারণ তাদের মতে এই ছিল যে, তিনি জগতের সাধারণ নিয়মের বিপরীতে পিতা ছাড়া শুধুমাত্র মায়ের গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি মানুষ হলে নিয়মানুযায়ী পিতা-মাতা উভয়ের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করতেন। আলোচ্য বাক্যে এর উত্তর দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। যেমন অন্যত্র বলেছেন যে, “ঈসার উদাহরণ তো আদমের মত” [সূরা আলে-ইমরানঃ ৫৯]

এ আয়াতেও উক্ত সন্দেহের নিরসন করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর সাধারণ নিয়মের বাইরে মসীহ আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা তার ইলাহ হওয়ার প্রমাণ হতে পারে না। লক্ষণীয় যে, আদমকে আল্লাহ তা'আলা পিতা ও মাতা উভয়ের মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছিলেন। সুতরাং আল্লাহ সবকিছুই করতে পারেন। তিনিই স্রষ্টা, রব ও উপাসনার যোগ্য। অন্য কেউ তার অংশীদার নয়। [সা’দী; মুয়াসসার; ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৭) নিশ্চয় তারা অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, ‘মারয়্যাম-তনয় মসীহই আল্লাহ।’ বল, ‘মারয়্যাম-তনয় মসীহ, তার মাতা এবং পৃথিবীর সকলকে যদি আল্লাহ ধ্বংস করতে ইচ্ছা করেন, তবে তাঁকে বাধা দেবার শক্তি কার আছে?’ আকাশ ও ভূ-মন্ডলে এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে, তার সার্বভৌমতব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। [1]

[1] এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজ অসীম ক্ষমতা ও পূর্ণ সার্বভৌমত্বের কথা বর্ণনা করেছেন। উদ্দেশ্য খ্রিষ্টানদের সেই আকীদা ও বিশ্বাসকে খন্ডন করা, যাতে তারা মনে করে যে, মসীহ (আঃ) স্বয়ং আল্লাহ। ‘মসীহ (আঃ) স্বয়ং আল্লাহ’ (যীশুই ঈশ্বর) এই আকীদায় বিশ্বাসী প্রথমে অল্প সংখ্যক লোক ছিল অর্থাৎ, খ্রিষ্টানদের একটি ফির্কাই ছিল, যারা ‘ইয়াকূবিয়াহ’ নামে পরিচিত। কিন্তু বর্তমানে তাদের প্রায় সকল ফির্কাই কোন না কোন দিক দিয়ে ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ মনে করে থাকে। এই জন্য খ্রিষ্টধর্মে ত্রিত্ববাদ অথবা ট্রিনিটির বিশ্বাস মূল ভিত্তি হিসাবে গুরুত্ব লাভ করেছে। অথচ কুরআনে কারীমের এই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, কোন নবী বা রসূলকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত করা প্রকাশ্য কুফরী। খ্রিষ্টানরা মসীহ (আঃ)-কে আল্লাহ বানিয়ে এই কুফরী করেছে। যদি অন্য কোন ফির্কা বা দল অন্য কোন নবী বা রসূলকে মানুষ ও রসূল হওয়ার আসন থেকে উঠিয়ে আল্লাহর আসনে আসীন করে, তাহলে তারাও কুফরী করবে। (আমরা এই ভ্রান্ত আকীদা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:৭২ لَقَدۡ کَفَرَ الَّذِیۡنَ قَالُوۡۤا اِنَّ اللّٰہَ ہُوَ الۡمَسِیۡحُ ابۡنُ مَرۡیَمَ ؕ وَ قَالَ الۡمَسِیۡحُ یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اعۡبُدُوا اللّٰہَ رَبِّیۡ وَ رَبَّکُمۡ ؕ اِنَّہٗ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِ الۡجَنَّۃَ وَ مَاۡوٰىہُ النَّارُ ؕ وَ مَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ اَنۡصَارٍ ﴿۷۲﴾

অবশ্যই তারা কুফরী করেছে, যারা বলেছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ হচ্ছেন মারইয়াম পুত্র মাসীহ’। আর মাসীহ বলেছে, ‘হে বনী ইসরাঈল, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদাত কর’। নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। আল-বায়ান

তারা অবশ্যই কুফরী করেছে যারা বলে, মারইয়াম পুত্র মাসীহই হচ্ছেন আল্লাহ। মাসীহ তো বলেছিল, হে বানী ইসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদাত কর যিনি আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীস্থাপন করে তার জন্য আল্লাহ অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন আর তার আবাস হল জাহান্নাম। যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। তাইসিরুল

নিশ্চয়ই তারা কাফির হয়েছে যারা বলে - মসীহ ইবনে মারইয়ামই আল্লাহ। অথচ মসীহ্ নিজেই বলেছিলঃ হে বানী ইসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর! যিনি আমার রাব্ব এবং তোমাদেরও রাব্ব; নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর অংশী স্থাপন করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম; এবং এরূপ অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী থাকবেনা। মুজিবুর রহমান

৭২. যারা বলে, নিশ্চয় আল্লাহু তিনি তো মারইয়াম-তনয় মসীহ, অবশ্যই তারা কুফরী করেছে(১)। অথচ মসীহ বলেছিলেন, হে ইসরাঈল-সন্তানগণ! তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদাত কর। নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন(২) এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।

(১) পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে বনী-ইসরাঈলের ঔদ্ধত্য ও তাদের অত্যাচার-উৎপীড়ন বর্ণনা করা হয়েছিল যে, আল্লাহ প্রেরিত রাসূল- যারা তাদের অক্ষয় জীবনের বার্তা এবং তাদের দুনিয়া ও আখেরাত সংশোধনের কার্যবিধি নিয়ে আগমন করেছিলেন, তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পরিবর্তে তারা তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। কতক নবীকে তারা মিথ্যারোপ করে এবং কতককে হত্যা করে ফেলে। আলোচ্য আয়াতে বনী-ইসরাঈলের কুটিলতার আরেকটি দিক উল্লেখ করা হয়েছে যে, মূৰ্খরা যেমন ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যতার এক প্রান্তে থেকে আল্লাহর নবীদের প্রতি মিথ্যারোপ করেছে এবং কতককে হত্যা করেছে, তেমনি এরাই বক্রতার অপর প্রান্তে পৌছে নবীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে বাড়াবাড়ি তো মারইয়াম তনয় মসীহ এ কথা বলে তারা কুফরী করল এবং কাফের হয়ে গেল।

ইতিহাস বলে যে, যারা এ ধরণের উক্তি করত তারা হচ্ছে, নাসারাদের মালেকিয়্যা, ইয়াকুবিয়্যা এবং নাসতুরিয়্যাহ সম্প্রদায়। [ইবন কাসীর] আলোচ্য আয়াতে যদিও এ উক্তিটি শুধু নাসারাদের বলে বর্ণিত হয়েছে। অন্যত্র এ ধরণের বাড়াবাড়ি ও পথভ্রষ্টতা ইয়াহুদী এবং নাসারা উভয়ের ব্যাপারেও বর্ণনা করা হয়েছে, (وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَٰلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ) অর্থাৎ “আর ইয়াহুদীরা বলে, উযায়র আল্লাহর পুত্র, এবং খৃস্টানরা বলে, মসীহ আল্লাহর পুত্র। ওটা তাদের মুখের কথা। আগে যারা কুফরী করেছিল ওরা তাদের মত কথা বলে। আল্লাহ ওদেরকে ধ্বংস করুন। কোন দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে?” [সূরা আত-তাওবাহঃ ৩০]


(২) অর্থাৎ নাসারারা যতই বাড়াবাড়ি করুক এবং ঈসাকে তাদের ইলাহ ঘোষণা করুক, ঈসা এতে কখনও সন্তুষ্ট নন। তিনি নিজেই এর বিপরীত ঘোষণা করেছিলেন। দুনিয়ায় আসার পর দোলনাতেই তার মুখের প্রথম কথা ছিল, (إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ)  অর্থাৎ আমি তো আল্লাহর বান্দা বা দাস। [সূরা মারইয়াম: ৩০) তিনি আরও বলেছিলেন, আমার ও তোমাদের রব একমাত্র আল্লাহ। তাঁরই ইবাদাত কর। সরল সঠিক পথ এটিই। [সূরা আলে ইমরান: ৫১; মারইয়াম: ৩৬; আয-যুখরুফ ৬৪] তাছাড়া যৌবনের পরবর্তী বয়সেও বলেছেন, তোমরা আল্লাহরই ইবাদাত কর, যারা তার সাথে অন্য কারও ইবাদাত করে তাদের জন্যে আল্লাহ জান্নাত হারাম করেছেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নামে। যেমন অন্য আয়াতেও আল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ শির্কের গোনাহ কখনও ক্ষমা করবেন না”। [সূরা আন-নিসা ৪৮, ১১৬]

অনুরূপভাবে জাহান্নামবাসীরা যখন জান্নাতবাসীদের কাছে খাদ্য ও পানি চাইবে, তখন তারা উত্তরে বলবে, নিশ্চয় আল্লাহ এ দুটি জিনিস কাফেরদের উপর হারাম করে দিয়েছেন। [সূরা আল-আরাফ: ৫০] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করতে বলেছেন যে, শুধু মুমিন মুসলিমরাই জান্নাতে যাবে’। [মুসলিম: ১১১] আরও বলেছেন, যতক্ষণ তোমরা ঈমানদার না হবে ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। [মুসলিম: ৫৪] সুতরাং ঈসা আলাইহিস সালাম কখনোও ইলাহ হওয়ার দাবী করেন নি এবং এটা তার পক্ষে শোভনীয়ও নয়। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭২) তারা নিঃসন্দেহে অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, ‘আল্লাহই মারয়্যাম-তনয় মসীহ।’[1]অথচ মসীহ বলেছিল, ‘হে বনী ইস্রাঈল! তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপাসনা কর।[2] অবশ্যই যে কেউ আল্লাহর অংশী করবে, নিশ্চয় আল্লাহ তার জন্য বেহেশ্ত্ নিষিদ্ধ করবেন ও দোযখ তার বাসস্থান হবে এবং অত্যাচারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।’ [3]

[1] একই বিষয় ১৭নং আয়াতেও আলোচিত হয়েছে। এখানে আহলে কিতাবদের ভ্রষ্টতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এ আয়াতে তাদের ঐ ফির্কার কুফরীর কথা প্রকাশ পেয়েছে, যারা মাসীহ (ঈসা (আঃ))-কে স্বয়ং আল্লাহ বলে।

[2] ঈসা (আঃ) দুগ্ধপোষ্য শিশু অবস্থায় আল্লাহর নির্দেশে (যে বয়সে সাধারণতঃ শিশুরা কথা বলতে পারে না) সর্বপ্রথম নিজের মুখ থেকে নিজের দাসত্বের কথা প্রকাশ করে বলেছিলেন, {إِنِّي عَبْدُ اللهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا} অর্থাৎ ‘আমি আল্লাহর বান্দা বা দাস, তিনি আমাকে কিতাব দান করেছেন।’ (সূরা মারয়্যাম ৩০) মাসীহ (আঃ) এটা বলেননি যে, আমিই আল্লাহ অথবা আল্লাহর পুত্র। বরং শুধুমাত্র তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আল্লাহর বান্দা বা দাস’ এবং তিনি পরিণত বয়সে উপনীত হয়ে (মানুষকে) এই দাওয়াতই দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, {إِنَّ اللهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيمٌ} অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার প্রভু এবং তোমাদের প্রভু, সুতরাং তোমরা তাঁরই ইবাদত কর --এটাই সরল পথ। (সূরা আলে ইমরান ৫১) এই সেই শব্দাবলী যা তিনি মায়ের কোলেও বলেছিলেন। (দ্রষ্টব্য; সূরা মারয়্যামের ৩৬নং আয়াত) অনুরূপ কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি আসমান হতে অবতরণ করবেন, যার সংবাদ সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে এবং তাঁর (অবতরণের) ব্যাপারে আহলে সুন্নাহ ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তিনি মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর আদর্শের অনুগামী হয়ে মানুষকে আল্লাহর একত্ব ও তাঁর আনুগত্যের প্রতি আহবান জানাবেন; নিজের ইবাদতের প্রতি নয়।

[3] মাসীহ (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ ও ইচ্ছায় নিজ মুখে দাসত্বের ও রিসালতের কথা প্রকাশ ঐ সময় করেছিলেন যখন তিনি মায়ের কোলে দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিলেন। অনুরূপ যখন তিনি পরিণত বয়সে উপনীত হলেন তখনও এই কথাই ঘোষণা করে (বলেছিলেন যে, আমি আল্লাহর বান্দা বা দাস ও তাঁর রসূল।) সেই সঙ্গে তিনি শিরকের ভয়াবহতা ও পরিণাম সম্পর্কে অবহিত করে বলেছিলেন যে, মুশরিকদের জন্য জান্নাত চিরতরে হারাম, আর তার কেউ সাহায্যকারীও হবে না যে, তাকে সে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে; যেরূপ মুশরিকরা মনে করে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-মায়েদা
৫:৭৩ لَقَدۡ کَفَرَ الَّذِیۡنَ قَالُوۡۤا اِنَّ اللّٰہَ ثَالِثُ ثَلٰثَۃٍ ۘ وَ مَا مِنۡ اِلٰہٍ اِلَّاۤ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ؕ وَ اِنۡ لَّمۡ یَنۡتَہُوۡا عَمَّا یَقُوۡلُوۡنَ لَیَمَسَّنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿۷۳﴾

অবশ্যই তারা কুফরী করেছে, যারা বলে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তিন জনের তৃতীয়জন’। যদিও এক ইলাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। আর যদি তারা যা বলছে, তা থেকে বিরত না হয়, তবে অবশ্যই তাদের মধ্য থেকে কাফিরদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব স্পর্শ করবে। আল-বায়ান

তারা অবশ্যই কুফরী করেছে যারা বলে আল্লাহ তিন জনের মধ্যে একজন, কারণ এক ইলাহ ছাড়া আর কোন সত্যিকার ইলাহ নেই। তারা যা বলছে তা থেকে তারা যদি নিবৃত্ত না হয়, তাহলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব গ্রাস করবেই। তাইসিরুল

নিঃসন্দেহে তারাও কাফির যারা বলেঃ ‘আল্লাহ তিনের (অর্থাৎ তিন মা‘বূদের) এক’, অথচ ইবাদাত পাবার যোগ্য এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহই নেই; আর যদি তারা স্বীয় উক্তিসমূহ হতে নিবৃত্ত না হয় তাহলে তাদের মধ্যে যারা কুফরীতে অটল থাকবে তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে। মুজিবুর রহমান

৭৩. তারা অবশ্যই কুফরী করেছে- যারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে তৃতীয়(১), অথচ এক ইলাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আর তারা যা বলে তা থেকে বিরত না হলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে, তাদের উপর অবশ্যই কষ্টদায়ক শাস্তি আপতিত হবে।

(১) অর্থাৎ ঈসা মসীহ আলাইহিস সালাম, রূহুল কুদ্‌স ও আল্লাহ, কিংবা মসীহ, মারইয়াম ও আল্লাহ -সবাই আল্লাহ। তাদের মধ্যে একজন অংশীদার হলেন আল্লাহ। এরপর তারা তিনজনই এক এবং একজনই তিন। এ হচ্ছে নাসারাদের সাধারণ বিশ্বাস। নাসারাদের মালেকিয়া, ইয়াকুবিয়্যা ও নাসতুরিয়্যা এ তিনটি দলই উপরোক্ত বিশ্বাস পোষণ করে। [ইবন কাসীর] এ যুক্তিবিরোধী ধর্মবিশ্বাসকে তারা জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক ভাষায় ব্যক্ত করে। অতঃপর বিষয়টি যখন কারো বোধগম্য হয় না, তখন একে ‘বুদ্ধি বহির্ভূত সত্য বলে আখ্যা দিয়ে ক্ষান্ত হয়। সুদ্দি বলেন, এখানে তিনের এক ইলাহ বলা হয়েছে। তিনজন বলতে, ঈসা, তার মা মারইয়াম এবং আল্লাহকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, অন্য আয়াতে কোন কোন নাসারাদের দ্বারা ঈসা ও তার মাকে ইলাহ হিসেবে গণ্য করার কথা উল্লেখ করে তা খণ্ডন করা হয়েছে। [আল-মায়েদাহ: ১১৬] ইবন কাসীর বলেন, এ মতটি অধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭৩) তারা নিশ্চয় অবিশ্বাসী (কাফের), যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন।’[1] অথচ এক উপাস্য ভিন্ন অন্য কোন উপাস্য নেই। তারা যা বলে তা হতে নিবৃত্ত না হলে তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছে, তাদের উপর অবশ্যই মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হবে।

[1] এ হল খ্রিষ্টানদের দ্বিতীয় ফির্কা, যারা তিন ঈশ্বরের দাবীদার ছিল। যেটাকে তারা (One God in Three Person) বলে। আর এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে যদিও খোদ তাদের মধ্যেই মতবিরোধ বিদ্যমান, তবুও সঠিক কথা এই যে, তারা ঈসা (আঃ) ও তাঁর মা মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)-কেও আল্লাহর সাথে (সমকক্ষ ভেবে) মাবূদ বা উপাস্যরূপে গণ্য করতো; যেরূপ কুরআন সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। আল্লাহ কিয়ামতের দিন ঈসা (আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করবেন, {أأنتَ قُلتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِن دُونِ اللّه} অর্থাৎ, তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার আম্মাকে মা’বূদ (উপাস্য) বানিয়ে নাও? (সূরা মাইদাহ ১১৬) এখান থেকে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, খ্রিষ্টানরা ঈসা (আঃ) ও তাঁর মাতা মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)-কে উপাস্য হিসাবে গণ্য করে। আর আল্লাহ তৃতীয় উপাস্য বা মা’বুদ। যাকে তারা ‘তিনের তৃতীয়’ বলে আখ্যায়ন করে। তাদের প্রথম বিশ্বাসের মতই আল্লাহ এ বিশ্বাসকেও কুফরী বলে মন্তব্য করেছেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:৭৬ فَلَمَّا جَنَّ عَلَیۡہِ الَّیۡلُ رَاٰ کَوۡکَبًا ۚ قَالَ ہٰذَا رَبِّیۡ ۚ فَلَمَّاۤ اَفَلَ قَالَ لَاۤ اُحِبُّ الۡاٰفِلِیۡنَ ﴿۷۶﴾

অতঃপর যখন রাত তার উপর আচ্ছন্ন হল, সে তারকা দেখল, বলল, ‘এ আমার রব’। অতঃপর যখন তা ডুবে গেল, তখন সে বলল, ‘যারা ডুবে যায় আমি তাদেরকে ভালবাসি না’। আল-বায়ান

রাতের আঁধার যখন তাকে আচ্ছন্ন করল তখন সে নক্ষত্র দেখতে পেল, (তখন) বলল, এটাই হচ্ছে আমার প্রতিপালক। কিন্তু যখন তা অস্তমিত হল, সে বলল, যা অস্তমিত হয়ে যায় তার প্রতি আমার কোন অনুরাগ নেই। তাইসিরুল

যখন রাতের অন্ধকার তাকে আবৃত করল তখন সে আকাশের একটি নক্ষত্র দেখতে পেল, আর বললঃ এটাই আমার রাব্ব! কিন্তু যখন ওটা অস্তমিত হল তখন সে বললঃ আমি অস্তমিত বস্তুকে ভালবাসিনা। মুজিবুর রহমান

৭৬. তারপর রাত যখন তাকে আচ্ছন্ন করল তখন তিনি তারকা দেখে বললেন, এ আমার রব। তারপর যখন সেটা অস্তমিত হল তখন তিনি বললেন, যা অস্তমিত হয় তা আমি পছন্দ করি না।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭৬) অতঃপর রাতের অন্ধকার যখন তাকে আচ্ছন্ন করল, তখন সে নক্ষত্র দেখে বলল, ‘ঐটিই আমার প্রতিপালক।’ অতঃপর যখন ঐটি অস্তমিত হল, তখন সে বলল, ‘যা অস্তমিত হয় তা আমি পছন্দ করি না।’ [1]

[1] অর্থাৎ, অস্তগামী উপাস্যদেরকে পছন্দ করি না। কারণ, অস্ত যাওয়া হল, অবস্থার পরিবর্তন ঘটার দলীল এবং তা হল, ধ্বংস হওয়ার দলীল। আর ধ্বংসশীল কখনো উপাস্য হতে পারে না।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:৭৭ فَلَمَّا رَاَ الۡقَمَرَ بَازِغًا قَالَ ہٰذَا رَبِّیۡ ۚ فَلَمَّاۤ اَفَلَ قَالَ لَئِنۡ لَّمۡ یَہۡدِنِیۡ رَبِّیۡ لَاَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡقَوۡمِ الضَّآلِّیۡنَ ﴿۷۷﴾

অতঃপর যখন সে চাঁদ উজ্জ্বলরূপে উদীয়মান দেখল, বলল, ‘এ আমার রব’। পরে যখন তা ডুবে গেল, বলল, ‘যদি আমার রব আমাকে হিদায়াত না করেন, নিশ্চয় আমি পথহারা কওমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’। আল-বায়ান

অতঃপর সে যখন চন্দ্রকে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখল তখন বলল, এটা হচ্ছে আমার প্রতিপালক। কিন্তু যখন তা অস্তমিত হল তখন সে বলল, আমার প্রতিপালক যদি আমাকে সঠিক পথের দিশা না দেন তাহলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। তাইসিরুল

আর যখন সে আকাশে চাঁদকে উজ্জ্বল আভায় দেখতে পেল তখন বললঃ এটাই আমার রাব্ব! কিন্তু ওটাও যখন অস্তমিত হল তখন বললঃ আমার রাব্ব যদি আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন তাহলে আমি পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। মুজিবুর রহমান

৭৭. তঃপর যখন তিনি চাঁদকে সমুজ্জ্বলরূপে উঠতে দেখলে তখন বললেন, ‘এটা আমার রব। যখন সেটাও অস্তমিত হল তখন বললেন, আমাকে আমার রব হিদায়াত না করলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের শামিল হব।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭৭) অতঃপর যখন সে চন্দ্রকে সমুজ্জ্বল দেখল, তখন বলল, ‘এটি আমার প্রতিপালক।’ যখন সেটি অস্তমিত হল, তখন সে বলল, ‘আমাকে আমার প্রতিপালক সৎপথ প্রদর্শন না করলে, আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হব।’

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:৭৮ فَلَمَّا رَاَ الشَّمۡسَ بَازِغَۃً قَالَ ہٰذَا رَبِّیۡ ہٰذَاۤ اَکۡبَرُ ۚ فَلَمَّاۤ اَفَلَتۡ قَالَ یٰقَوۡمِ اِنِّیۡ بَرِیۡٓءٌ مِّمَّا تُشۡرِکُوۡنَ ﴿۷۸﴾

অতঃপর যখন সে সূর্য উজ্জ্বলরূপে উদীয়মান দেখল, বলল, ‘এ আমার রব, এ সবচেয়ে বড়’। পরে যখন তা ডুবে গেল, তখন সে বলল, ‘হে আমার কওম, তোমরা যা শরীক কর, নিশ্চয় আমি তা থেকে মুক্ত’। আল-বায়ান

অতঃপর যখন সে সূর্যকে অতি উজ্জ্বল হয়ে উদিত হতে দেখল তখন বলল, এটাই হচ্ছে আমার প্রতিপালক, এটাই হচ্ছে সব থেকে বড়। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হল তখন সে বলল, হে আমার জাতির লোকেরা! তোমরা যেগুলোকে (আল্লাহর) অংশীদার স্থির কর সেগুলোর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। তাইসিরুল

অতঃপর যখন সে সূর্যকে উদ্ভাসিত দেখতে পেল তখন সে বললঃ এটিই আমার রাব্ব! এটি বৃহত্তর। অতঃপর যখন ওটা ডুবে গেল তখন বললঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের শিরকের সাথে আমার আদৌ কোন সম্পর্ক নেই, আমি মুক্ত। মুজিবুর রহমান

৭৮. অতঃপর যখন তিনি সূর্যকে দীপ্তিমানরূপে উঠতে দেখলেন তখন বললেন, এটা আমার রব, এটা সবচেয়ে বড়। যখন এটাও অস্তমিত হল, তখন তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাকে আল্লাহর শরীক কর তার সাথে আমার কোন সংশ্ৰব নেই।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭৮) অতঃপর যখন সে সূর্যকে প্রদীপ্ত দেখল, তখন বলল, ‘এটি[1] আমার প্রতিপালক, এটি সর্ববৃহৎ।’ যখন সেটিও অস্তমিত হল, তখন সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাকে আল্লাহর অংশী কর, তা থেকে আমি নির্লিপ্ত।[2]

[1] شَمْسٌ (সূর্য) আরবীতে স্ত্রীলিঙ্গ, অথচ ‘ইসমে ইশারা’ অব্যয় (পুংলিঙ্গ) ব্যবহার হয়েছে। কারণ, এ থেকে লক্ষ্য হল, الطالع অর্থাৎ, উদীয়মান এই সূর্য আমার প্রতিপালক। কেননা, এটাই সব থেকে বড়। যেমন, সূর্য-পূজারীরা ভুল বুঝে এর পূজা করে। আকাশে অবস্থিত গ্রহ-নক্ষত্রসমূহের মধ্যে (মানুষের চোখে) সূর্যই হল সব চেয়ে বড়, সর্বাধিক দীপ্তিমান এবং মানব জীবনের স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য এর গুরুত্ব ও উপকারিতা যে কত, তা বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন হয় না। এই জন্যই বস্তুপূজারীদের মাঝে সূর্যের পূজা সাধারণভাবে বিদ্যমান থেকেছে। ইবরাহীম (আঃ) অতি সূক্ষ্ণভাবে চাঁদ ও সূর্য-পূজারীদের জন্য তাদের উপাস্যদের অযোগ্যতার কথা সুস্পষ্ট করেন।

[2] অর্থাৎ, সেই সমস্ত জিনিসের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, যেগুলোকে তোমরা আল্লাহর শরীক নির্ণয় করেছ এবং যেগুলোর তোমরা পূজাও করছ। কারণ, এদের মধ্যে পরিবর্তন সূচিত হয়। কখনো উদয় হয়, আবার কখনো অস্ত যায়। আর এ থেকে প্রমাণ হয় যে, এরা সৃষ্টি এবং এদের স্রষ্টা এমন কেউ আছেন, যাঁর নির্দেশের এরা আওতাধীন। আর এরা যখন নিজেরাই সৃষ্টি এবং অন্য কারো আওতাধীন, তখন কারো ইষ্টানিষ্টের উপর কিভাবে ক্ষমতা রাখতে পারে?

** প্রসিদ্ধি আছে যে, সে যুগের বাদশাহ নমরূদ তার একটি স্বপ্ন এবং জ্যোতিষীদের ব্যাখ্যার আলোকে নবজাত শিশুদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল। ইবরাহীম (আঃ) সে যুগেই জন্ম গ্রহণ করেন। তাই তাঁকে একটি গুহার মধ্যে গোপন রাখা হয়েছিল, যাতে নমরূদ ও তার কর্মচারীদের হাতে হত্যা হওয়া থেকে বেঁচে যান। সেই গুহাতে যখন তাঁর বিবেক-বুদ্ধির উন্মেষ ঘটল এবং তিনি তারা, চাঁদ ও সূর্য দেখলেন, তখন স্বীয় মনের এই প্রভাবগত খেয়াল ব্যক্ত করলেন। কিন্তু গুহা সম্পর্কীয় এ কথার কোন ভিত্তি নেই। কুরআনের ভাষা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি তাঁর জাতির সাথে কথোপকথনের সময় এই ধরনের কথা (অভিনয়ছলে) বলেছিলেন। এই কারণেই পরিশেষে (হুজ্জত পেশ করে) জাতিকে সম্বোধন করে বললেন, আমি তোমাদের নির্ধারিত শরীক থেকে মুক্ত। আর এই কথোপকথনের উদ্দেশ্যই ছিল, জাতিকে তাদের বাতিল উপাস্যগুলোর প্রকৃত অবস্থার রহস্য উদ্ঘাটন করা। (এই জন্য অনেকে বলেছেন, ইবরাহীম (আঃ) প্রশ্নবোধক শব্দে বলেছিলেন, ‘এটি আমার প্রতিপালক?’)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:৭৯ اِنِّیۡ وَجَّہۡتُ وَجۡہِیَ لِلَّذِیۡ فَطَرَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ حَنِیۡفًا وَّ مَاۤ اَنَا مِنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ﴿ۚ۷۹﴾

‘নিশ্চয় আমি নিবিষ্ট করেছি আমার চেহারা একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্য, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই’। আল-বায়ান

আমি একনিষ্ঠ হয়ে তাঁর দিকে আমার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি যিনি আকাশমন্ডলী আর পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন। আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। তাইসিরুল

আমার মুখমন্ডলকে আমি একনিষ্ঠভাবে সেই মহান সত্তার দিকে ফিরাচ্ছি যিনি নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছেন, আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। মুজিবুর রহমান

৭৯. আমি একনিষ্ঠভাবে তার দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।(১)

(১) আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে যে, তারকাপুঞ্জ ইবাদত পাওয়ার যোগ্য নয়, যেমনিভাবে মূর্তি ও প্রতিমা উপাস্যের যোগ্য নয়। বলা হচ্ছে, এক রাত্রিতে যখন অন্ধকার সমাচ্ছন্ন হলো এবং একটি নক্ষত্রের উপর দৃষ্টি পড়ল, তখন তিনি স্বজাতিকে শুনিয়ে বললেন, এ নক্ষত্র আমার রব। উদ্দেশ্য এই যে, তোমাদের ধারণা ও বিশ্বাস অনুযায়ী এটিই আমার ও তোমাদের রব। এখন অল্পক্ষণের মধ্যেই এর স্বরূপ দেখে নেবে। কিছুক্ষণ পর নক্ষত্রটি অস্তমিত হয়ে গেলে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম জাতিকে জব্দ করার চমৎকার সুযোগ পেলেন। তিনি বললেন, আমি অস্তগামী বস্তুসমূহকে ভালবাসি না। যে বস্তু ইলাহ কিংবা উপাস্য হবে, তার সর্বাধিক ভালবাসার পাত্র হওয়া উচিত।

এরপর অন্য কোন রাত্রিতে চাঁদকে ঝলমল করতে দেখে পুনরায় জাতিকে শুনিয়ে পূর্বোক্ত পন্থা অবলম্বন করলেন এবং বললেন, (তোমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী) এটি আমার রব। কিন্তু এর স্বরূপও কিছুক্ষণের মধ্যেই ফুটে উঠবে। সেমতে চন্দ্র যখন অস্তাচলে ডুবে গেল, তখন বললেন, যদি আমার রব আমাকে পথ প্রদর্শন না করতে থাকেন, তবে আমিও তোমাদের মত পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম এবং চাঁদকেই স্বীয় পালনকর্তা এবং উপাস্য মনে করে বসতাম। কিন্তু এর উদয়াস্তের পরিবর্তনশীল অবস্থা আমাকে সতর্ক করেছে যে, এটিও আরাধনার যোগ্য নয়।

এ আয়াতে এদিকেও ইঙ্গিত আছে যে, আমার রব অন্য কোন শক্তি, যার পক্ষ থেকে আমাকে সর্বক্ষণ পথ প্রদর্শন করা হয়। এরপর একদিন সূর্য উদিত হতে দেখে পুনরায় জাতিকে শুনিয়ে ঐভাবেই বললেনঃ (তোমাদের ধারণা অনুযায়ী) এটি আমার রব এবং এটি বৃহত্তম। কিন্তু এ বৃহত্তমের স্বরূপও অতি সত্ত্বর দৃষ্টিগোচর হয়ে যাবে। সেমতে যথাসময়ে সূর্যও অন্ধকারে মুখ লুকালে জাতির সামনে সর্বশেষ প্রমাণ সম্পন্ন করার পর প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরলেন এবং বললেন, হে আমার জাতি।

আমি তোমাদের এসব মুশরিকসুলভ ধারণা থেকে মুক্ত। তোমরা আল্লাহ তা'আলার সৃষ্ট জীবকেই আল্লাহর অংশীদার স্থির করেছ। অতঃপর এ স্বরূপ উদঘাটন করলেন যে, আমার ও তোমাদের পালনকর্তা এসব সৃষ্টবস্তুর মধ্যে কোনটিই হতে পারে না। এরা স্বীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে অন্যের মুখাপেক্ষী এবং প্রতি মুহুর্তে উত্থান-পতন, উদয়-অস্ত ইত্যাদি পরিবর্তনের আবর্তে নিপতিত। বরং সেই সত্তা আমাদের সবার রব, যিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যে সৃষ্ট সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন। তাই আমি আমার চেহারা তোমাদের স্বনির্মিত প্রতিমা এবং পরিবর্তন ও প্রভাবের আবর্তে নিপতিত নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে ফিরিয়ে আল্লাহ ‘ওয়াহদাহু লা-শারীকা লাহু’-এর দিকে করে নিয়েছি এবং আমি তোমাদের ন্যায় মুশরিক বা অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।

এ বিতর্কে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নবীসুলভ প্রজ্ঞা ও উপদেশ প্রয়োগ করে এমন এক পন্থা অবলম্বন করলেন, যাতে প্রত্যেক সচেতন মানুষের মন ও মস্তিস্ক প্রভাবান্বিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সত্যকে উপলব্ধি করে ফেলে। মনে রাখতে হবে যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের এ তর্ক ছিল প্রতিপক্ষকে নিজের মত ও পথের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে। তিনি সম্পূর্ণ জেনে-বুঝেই প্রতিপক্ষের দাবী খণ্ডন করার জন্য এ প্রজ্ঞার আশ্রয় নিয়েছিলেন, যাতে তারা উপস্থিত সকল বস্তুর ইবাদতের অসারতা বুঝতে সক্ষম হয়। [দেখুন, সা’দী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৭৯) নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ[1] ফিরাচ্ছি, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।’

[1] মুখমন্ডল বা চেহারার উল্লেখ এ­ই জন্য করেছেন যে, চেহারাই হল মানুষের আসল পরিচয়ের জায়গা। আর এ থেকে লক্ষ্য হয় ব্যক্তি। অর্থাৎ, আমার ইবাদত ও তাওহীদের উদ্দেশ্য হল মহান আল্লাহ; যিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:১০১ بَدِیۡعُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ اَنّٰی یَکُوۡنُ لَہٗ وَلَدٌ وَّ لَمۡ تَکُنۡ لَّہٗ صَاحِبَۃٌ ؕ وَ خَلَقَ کُلَّ شَیۡءٍ ۚ وَ ہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ﴿۱۰۱﴾

তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। কিভাবে তার সন্তান হবে অথচ তার কোন সঙ্গিনী নেই! আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রতিটি জিনিসের ব্যাপারে সর্বজ্ঞ। আল-বায়ান

তিনি আকাশমন্ডলী ও যমীনের উদ্ভাবক, কীভাবে তাঁর সন্তান হতে পারে যেহেতু তাঁর কোন সঙ্গীণীই নেই, সব কিছু তো তিনিই সৃষ্টি করেছেন, আর প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে তিনি পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। তাইসিরুল

তিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা; তাঁর সন্তান হবে কি করে? অথচ তাঁর জীবন সঙ্গিনীই কেহ নেই। তিনিই প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন, প্রত্যেকটি জিনিস সম্পর্কে তাঁর ভাল রুপে জ্ঞান রয়েছে। মুজিবুর রহমান

১০১. তিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, তার সন্তান হবে কিভাবে? তার তো কোন সঙ্গিনী নেই। আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক বস্তু সম্বন্ধে তিনি সবিশেষ অবগত।

-

তাফসীরে জাকারিয়া

(১০১) তিনি আকাশমন্ডলী ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবনকর্তা, তাঁর সন্তান হবে কিরূপে? তাঁর তো কোন স্ত্রী নেই, তিনিই তো সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন[1] এবং প্রত্যেক বস্তু সম্বন্ধে তিনিই সবিশেষ অবহিত।

[1] অর্থাৎ, যেমন আল্লাহ তাআলা এই সমস্ত জিনিসকে সৃষ্টি করার ব্যাপারে এক ও একক, তাঁর কোন শরীক নেই, অনুরূপ তিনিই এই যোগ্যতার দাবী রাখেন যে, একমাত্র কেবল তাঁরই ইবাদত করা হোক। তাঁর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক স্থির করা না হোক। কিন্তু মানুষ এই একক সত্তাকে বাদ দিয়ে জ্বিনদেরকে তাঁর শরীক বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তারাও আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট। মুশরিকরা তো মূর্তির অথবা কবরে সমাধিস্থ ব্যক্তিবর্গের পূজা করত। কিন্তু এখানে বলা হয়েছে যে, তারা জ্বিনদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়ে রেখেছে। আসলে ব্যাপার হল, এখানে জ্বিনদের বলতে শয়তানদেরকে বুঝানো হয়েছে এবং শয়তানদের কথা অনুযায়ীই শিরক করা হয়, তাই প্রকৃতপক্ষে পূজা ও উপাসনা শয়তানেরই করা হয়। এই বিষয়টাকে কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, সূরা নিসার ১১৭নং, সূরা মারয়্যামের ৪৪ নং, সূরা ইয়াসীনের ৬০ নং এবং সূরা সাবা’র ৪১ নং আয়াতে।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:১৫১ قُلۡ تَعَالَوۡا اَتۡلُ مَا حَرَّمَ رَبُّکُمۡ عَلَیۡکُمۡ اَلَّا تُشۡرِکُوۡا بِہٖ شَیۡئًا وَّ بِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا ۚ وَ لَا تَقۡتُلُوۡۤا اَوۡلَادَکُمۡ مِّنۡ اِمۡلَاقٍ ؕ نَحۡنُ نَرۡزُقُکُمۡ وَ اِیَّاہُمۡ ۚ وَ لَا تَقۡرَبُوا الۡفَوَاحِشَ مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَ مَا بَطَنَ ۚ وَ لَا تَقۡتُلُوا النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰہُ اِلَّا بِالۡحَقِّ ؕ ذٰلِکُمۡ وَصّٰکُمۡ بِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَعۡقِلُوۡنَ ﴿۱۵۱﴾

বল, ‘এসো, তোমাদের উপর তোমাদের রব যা হারাম করেছেন, তা তিলাওয়াত করি যে, তোমরা তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না এবং মা-বাবার প্রতি ইহসান করবে আর দারিদ্রের কারণে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। আমিই তোমাদেরকে রিয্ক দেই এবং তাদেরকেও। আর অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হবে না- তা থেকে যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে। আর বৈধ কারণ ছাড়া তোমরা সেই প্রাণকে হত্যা করো না, আল্লাহ যা হারাম করেছেন। এগুলো আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার। আল-বায়ান

বল, ‘এসো, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ করেছেন তা পড়ে শোনাই, তা এই যে, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর, দরিদ্রতার ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না, আমিই তোমাদেরকে আর তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি, প্রকাশ্য বা গোপন কোন অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না, আল্লাহ যে প্রাণ হরণ করা হারাম করেছেন তা ন্যায় সঙ্গত কারণ ছাড়া হত্যা করো না। এ সম্পর্কে তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা চিন্তা- ভাবনা করে কাজ কর। তাইসিরুল

লোকদেরকে বলঃ তোমরা এসো! তোমাদের রাব্ব তোমাদের প্রতি কি কি বিধি-নিষেধ আরোপ করেছেন তা আমি তোমাদেরকে পাঠ করে শোনাই; তা এই যে, তোমরা তাঁর সাথে কেহকেই শরীক করবেনা, মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্রতার ভয়ে নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করবেনা। কেননা আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিই; আর অশ্লীল কাজ ও কথার নিকটেও যেওনা, তা প্রকাশ্যই হোক কিংবা গোপনীয়ই হোক, আর আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন - যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করনা। এসব বিষয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন করতে পার। মুজিবুর রহমান

১৫১. বলুন(১), এস(২), তোমাদের রব তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন তোমাদেরকে তা তিলাওয়াত করি, তা হচ্ছে, তোমরা তাঁর সাথে কোন শরীক করবে না(৩) পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে(৪), দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, আমরাই তোমাদেরকে ও তাদেরকে রিযক দিয়ে থাকি(৫)। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল কাজের ধারে কাছেও যাবে না(৬)। আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা তাকে হত্যা করবে না(৭)। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা বুঝতে পার।

(১) আগত আয়াতসমূহে সেসব বস্তু সম্পর্কে বলা হয়েছে, যেগুলোকে আল্লাহ্ তাআলা হারাম করেছেন। বিশদ বর্ণনায় নয়টি বস্তুর উল্লেখ হয়েছে। এরপর দশম নির্দেশ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “এ দ্বীনই হচ্ছে আমার সরল পথ। এ পথের অনুসরণ কর”। এতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দ্বীন যে বিষয়কে হালাল বলেছে, তাকে হালাল এবং যে বিষয়কে হারাম বলেছে, তাকে হারাম মনে করবে- নিজের পক্ষ থেকে হালাল-হারামের ফতোয়া জারি করবে না। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনীত পথকে অনুসরনের তাগিদ দেয়া হয়েছে। তাঁর পথ ব্যতীত আরও বহু পথ রয়েছে সেগুলো মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। সঠিক পথ একটি, আর বাতিল পথ অনেক। যারা আল্লাহর পথে চলবে আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। [সা’দী]

আগত আয়াতসমূহে যে দশটি বিষয় বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে, (১) আল্লাহ তা'আলার সাথে কাউকে ইবাদাত ও আনুগত্যে অংশীদার স্থির করা, (২) পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার না করা, (৩) দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা করা, (৪) অশ্লীল কাজ করা, (৫) কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা, (৬) ইয়াতীমের ধন-সম্পদ অবৈধভাবে আত্মসাৎ করা, (৭) ওজন ও মাপে কম দেয়া, (৮) সাক্ষ্য, ফয়সালা অথবা অন্যান্য কথাবার্তায় অবিচার করা, (৯) আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ না করা এবং (১০) আল্লাহ্ তা'আলার সোজা-সরল পথ ছেড়ে অন্য পথ অবলম্বন করা। মুফাসসির আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ সূরা আলে ইমরানের মুহকাম আয়াতের বর্ণনায় এ আয়াতগুলোকেই বোঝানো হয়েছে। আদম 'আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সমস্ত নবীগণের শরীআতই এসব আয়াত সম্পর্কে একমত। কোন দ্বীন বা শরীআতে এগুলোর কোনটিই মনসুখ বা রহিত হয়নি। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৩১৭] আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যে কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ যে বিষয়ের উপর ছিলেন সেটা জানতে চায় সে যেন সূরা আল-আন’আমের এ আয়াতগুলো পড়ে নেয়। [ইবন কাসীর]


(২) আয়াতগুলোর প্রথমেই বলা হয়েছে تَعَالَوْا যার অর্থঃ ‘এস’। মূলতঃ উচ্চস্থানে দণ্ডায়মান হয়ে নিম্নের লোকদেরকে নিজের কাছে ডাকা অর্থে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। [কাশ্‌শাফ; কুরতুবী] এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, এ দাওয়াত কবুল করার মধ্যেই তাদের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য বিদ্যমান। এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, আপনি তাদেরকে বলুন, এস, যাতে আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শোনাতে পারি যেগুলো আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের জন্য হারাম করেছেন। এটা প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত বার্তা। এতে কারো কল্পনা, আন্দাজ ও অনুমানের কোন প্রভাব নেই [বাগভী] যাতে তোমরা এসব বিষয় থেকে আত্মরক্ষা করতে যত্নবান হও এবং অনর্থক নিজের পক্ষ থেকে আল্লাহর হালালকৃত বিষয়সমূহকে হারাম না কর। এ আয়াতে যদিও সরাসরি মক্কার মুশরিকদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, কিন্তু বিষয়টি ব্যাপক হওয়ার কারণে সমগ্র মানব জাতিই এর আওতাধীন- মুমিন হোক কিংবা কাফের, আরব হোক কিংবা অনারব, উপস্থিত লোকজন হোক কিংবা অনাগত বংশধর। [দেখুন, তাফসীর আল-মানার]


(৩) সর্বপ্রথম মহাপাপ শির্ক, যা হারাম করা হয়েছেঃ সযত্ন সম্বোধনের পর হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহের তালিকায় সর্বপ্রথম বলা হয়েছেঃ আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক বা অংশীদার করো না। আরবের মুশরিকদের মত দেব-দেবীদেরকে বা মূর্তিকে ইলাহ বা উপাস্য মনে করো না। ইয়াহুদী ও নাসারাদের মত নবীগণকে আল্লাহ কিংবা আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করো না। অন্যদের মত ফিরিশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে আখ্যা দিও না। মূৰ্খ জনগণের মত নবী ও ওলীগণকে জ্ঞান ও শক্তি-সামর্থ্যে আল্লাহর সমতুল্য সাব্যস্ত করো না। আল্লাহর জন্য যে সমস্ত ইবাদাত করা হয়, তা অপর কাউকে দিও না; যেমন, দোআ, যবেহ, মানত ইত্যাদি।

এখানে شَيْئًا এর অর্থ এরূপ হতে পারে যে, ‘জলী’ অর্থাৎ প্রকাশ্য শির্ক ও ‘খফী’ অর্থাৎ প্রচ্ছন্ন শির্ক- এ প্রকারদ্বয়ের মধ্য থেকে কোনটিতেই লিপ্ত হয়ো না। প্রকাশ্য শির্কের অর্থ সবাই জানে যে, ইবাদাত-আনুগত্য অথবা অন্য বিশেষ গুণে অন্যকে আল্লাহ তা'আলার সমতুল্য অথবা তার অংশীদার সাব্যস্ত করা। প্রচ্ছন্ন শির্ক এই যে, নিজ কাজ-কর্মে দ্বীনী ও পার্থিব উদ্দেশ্যসমূহে এবং লাভ-লোকসানে আল্লাহ তা'আলাকে কার্যনির্বাহী বলে বিশ্বাস করেও কার্যতঃ অন্যান্যকে কার্যনির্বাহী মনে করা এবং যাবতীয় প্রচেষ্টা অন্যদের সাথেই জড়িত রাখা। এছাড়া লোক দেখানো ইবাদত করা, অন্যদেরকে দেখানোর জন্য সালাত ইত্যাদি ঠিকমত আদায় করা, নাম-যশ লাভের উদ্দেশ্যে দান-সদকা করা অথবা কার্যতঃ লাভ-লোকসানের মালিক আল্লাহ ছাড়া অন্যকে সাব্যস্ত করা ইত্যাদিও প্রচ্ছন্ন শির্কের অন্তর্ভুক্ত। [দেখুন, আল-মানার; সা’দী; আশ-শির্ক ফীল কাদীম ওয়াল হাদীস, ১৬৮-১৮০; ১২৯৫-১৩১০]


(৪) দ্বিতীয় গোনাহ পিতা-মাতার সাথে অসদ্ব্যবহারঃ আয়াতে বলা হয়েছেঃ “পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা”। উদ্দেশ্য এই যে, পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ো না। তাদেরকে কষ্ট দিও না; কিন্তু বিজ্ঞজনোচিত ভঙ্গিতে বলা হয়েছে যে, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। অন্য আয়াতে তাদের আনুগত্য ও সুখবিধানকে আল্লাহ তা'আলার ইবাদাতের সাথে সংযুক্ত করে বলা হয়েছে, “আপনার রব নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে”। [সূরা আল-ইসরা: ২৩] অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, “আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং পিতা-মাতার। তারপর আমার দিকেই প্রত্যাবর্তন”। [সূরা লুকমান: ১৪] অর্থাৎ বিপরীত করলে শাস্তি পাবে।

তাছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “সর্বোত্তম কাজ কোনটি? তিনি উত্তরে বললেনঃ সঠিক ওয়াক্তে সালাত আদায় করা, তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ ‘এরপর কোনটি? উত্তর হলঃ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার। আবার প্রশ্ন করলেনঃ ‘এরপর কোনটি? উত্তর হলঃ 'আল্লাহর পথে জিহাদ'। [বুখারীঃ ৫২৭, মুসলিমঃ ৮৫]

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার বললেন, লাঞ্ছিত হয়েছে, লাঞ্ছিত হয়েছে, লাঞ্ছিত হয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কে লাঞ্ছিত হয়েছে? তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তি পিতা-মাতাকে বার্ধক্য অবস্থায় পেয়েও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে নি’। [মুসলিমঃ ২৫৫১]


(৫) তৃতীয় হারাম সন্তান হত্যাঃ আয়াতে বর্ণিত তৃতীয় হারাম বিষয় হচ্ছে সন্তান হত্যা। এখানে পূর্বাপর সম্পর্ক এই যে, ইতোপূর্বে পিতা-মাতার হক বর্ণিত হয়েছে, যা সন্তানের কর্তব্য। এখন সন্তানের হক বর্ণিত হচ্ছে, যা পিতা-মাতার কর্তব্য। জাহেলিয়াত যুগে সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা কিংবা হত্যা করার ব্যাপারটি ছিল সন্তানের সাথে অসদ্ব্যবহারের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আয়াতে তা নিষিদ্ধ করে বলা হয়েছেঃ “দারিদ্র্যের কারণে স্বীয় সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমরা তোমাদেরকে এবং তাদেরকে- উভয়কেই জীবিকা দান করব।” জাহেলিয়াত যুগে এ নিকৃষ্টতম নির্দয়-পাষণ্ড প্রথা প্রচলিত ছিল যে, কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করলে কাউকে জামাতা করার লজ্জা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো। মাঝে মাঝে জীবিকা নির্বাহ কঠিন হবে মনে করে পাষণ্ডরা নিজ হাতে সন্তানদেরকে হত্যা করত। কুরআনুল কারীম এ কু-প্রথা রহিত করে দিয়েছে। [ইবন কাসীর]


(৬) চতুর্থ হারাম নির্লজ্জ কাজঃ আয়াতে বর্ণিত চতুর্থ হারাম বিষয় হচ্ছে নির্লজ্জ কাজ। এ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “প্রকাশ্য হোক কিংবা গোপন, যে কোন রকম অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না”। فواحش শব্দের সাধারণ অর্থঃ অশ্লীলতা ও নির্লজ্জ কাজ। যাবতীয় বড় গোনাহ فحش ও فحشاء এর অর্থের অন্তর্ভুক্ত। মোটকথা, এ আয়াত নির্লজ্জতার প্রকৃত অর্থের দিক দিয়ে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সমস্ত গোনাহকে এবং সাধারণের মধ্যে প্রসিদ্ধ অর্থের দিক দিয়ে ব্যভিচারের প্রকাশ্য ও গোপন সকল পন্থাকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এ সম্পর্কে নির্দেশ এই যে, এগুলোর কাছেও যেও না। কাছে যাওয়ার অর্থ এরূপ মজলিশ ও স্থান থেকে বেঁচে থাকা যেখানে গেলে গোনাহে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং এরূপ কাজ থেকেও বেঁচে থাক, যা দ্বারা এসব গোনাহর পথ খুলে যায়। কারণ, যে লোক নিষিদ্ধ জায়গার আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, সে তাতে প্রবেশ করার কাছাকাছি হয়ে যায়। [সা’দী]

অন্য আয়াতেও বলা হয়েছে, “বলুন, নিশ্চয় আমার রব হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা [সূরা আল-আরাফ: ৩৩] অনুরূপভাবে অন্যত্র এসেছে, “আর তোমরা প্রকাশ্য এবং প্রচ্ছন্ন পাপ বর্জন কর। [সূরা আল-আনআমঃ ১২০] এ সব আয়াত একই অর্থবোধক। এসব আয়াতেই অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা পরিত্যাগ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর চেয়ে বেশী আত্মাভিমানী কেউই নেই, সেজন্য তিনি প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য যাবতীয় অশ্লীলতা হারাম ঘোষণা করেছেন। [বুখারী ৪৬৩৪; মুসলিম: ২৭৬০]


(৭) পঞ্চম হারাম বিষয় অন্যায় হত্যাঃ এ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “আল্লাহ্ তাআলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না, তবে ন্যায়ভাবে”। এ ন্যায়ভাবের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ তিনটি কারণ ছাড়া কোন মুসলিমের খুন হালাল নয়। (এক) বিবাহিত হওয়া সত্বেও ব্যভিচারে লিপ্ত হলে, (দুই) অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করলে তার কেসাস হিসাবে তাকে হত্যা করা যাবে এবং (তিন) সত্যদ্বীন ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে মুসলিমদের জামা'আত থেকে পৃথক হয়ে গেলে। [বুখারীঃ ৬৮৭৮, মুসলিমঃ ১৬৭৬]


বিনা কারণে মুসলিমকে হত্যা করা যেমন হারাম, তেমনিভাবে এমন কোন অমুসলিমকে হত্যা করাও হারাম, যে কোন ইসলামী দেশের প্রচলিত আইন মান্য করে বসবাস করে কিংবা যার সাথে মুসলিমের চুক্তি থাকে। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন যিম্মী অমুসলিমকে হত্যা করে, সে আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। যে আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধী সত্তর বছরের দূরত্ব হতে পাওয়া যায়। [ইবন মাজাহ: ২৬৮৭]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৫১) বল, এসো, তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালক যা নিষিদ্ধ করেছেন তা তোমাদেরকে পড়ে শোনাই।[1] তা এইঃ তোমরা কোন কিছুকে তাঁর অংশী করবে না,[2] মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে,[3] দারিদ্রে্র কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না।[4] আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল আচরণের নিকটবর্তীও হয়ো না এবং আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত[5] তাকে হত্যা করো না। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন কর।

[1] অর্থাৎ, সেগুলো নয়, যেগুলো তোমরা আল্লাহর অবতীর্ণকৃত কোন দলীল ছাড়া কেবল নিজেদের ভ্রান্ত খেয়াল এবং অমূলক ধারণার ভিত্তিতে হারাম গণ্য করেছ। বরং হারাম হল সেই জিনিসগুলো, যেগুলোকে তোমাদের প্রতিপালক হারাম ঘোষণা করেছেন। কারণ, তোমাদের স্রষ্টা এবং আহারদাতা তিনিই এবং প্রতিটি জিনিসের জ্ঞানও তাঁরই কাছে। কাজেই এ অধিকারও তাঁরই যে, তিনি যে জিনিসটা চান হালাল এবং যে জিনিসটা চান হারাম করেন। সুতরাং আমি তোমাদেরকে এই জিনিসগুলোর বিশদ বিবরণ দিচ্ছি, যার তাকীদ তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে এসেছে।

[2] أَلاَّ تُشْرِكُوْا এর পূর্বে أَوْصَاكُمْ ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁর সাথে তোমরা অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করো না। শিরক হল সব চেয়ে বড় পাপ। (তওবা ছাড়া) এ পাপের কোন ক্ষমা নেই। মুশরিকের উপর জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম ওয়াজিব। কুরআন মাজীদে এ বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে বারবার বর্ণনা করা হয়েছে এবং নবী করীম (সাঃ)ও বহু হাদীসে এর বিশ্লেষণ সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তা সত্ত্বেও বাস্তব এটাই যে, মানুষ শয়তানের চক্রান্তে পড়ে ব্যাপকহারে শিরকী কাজ সম্পাদন করে চলেছে।

[3] অর্থাৎ, মাতা-পিতার সাথে অসদ্ব্যবহার করবে না। মহান আল্লাহর তাওহীদ (একত্বতা) এবং তাঁর আনুগত্যের পর এখানেও (এবং কুরআনের অন্য অনেক স্থানেও) পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এ থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, প্রতিপালকের আনুগত্যের পর পিতা-মাতার আনুগত্য করার গুরুত্ব অপরিসীম। যদি কেউ এই ‘রুবূবিয়্যাতে সুগরা’ (পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের) দাবীসমূহ পূরণ না করে, তবে সে ‘রুবূবিয়্যাতে কুবরা’ (আল্লাহর আনুগত্যের) দাবীসমূহ পূরণ করতেও অসফল হবে।

[4] জাহেলী যুগের এই জঘন্য কাজ বর্তমানে জন্ম-নিয়ন্ত্রণের নামে সারা পৃথিবীতে অতি ধুমধামের সাথে চলছে। আল্লাহ এ থেকে আমাদেরকে হিফাযত করুন!

[5] অর্থাৎ, খুনের বদলে খুন। আর তা কেবল বৈধই নয়, বরং নিহতের উত্তরাধিকারী যদি মাফ করে না দেয়, তবে এ হত্যা অতি জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ} ‘‘ক্বিসাসে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন।’’ (সূরা বাক্বারাহ ১৭৯)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:১৬২ قُلۡ اِنَّ صَلَاتِیۡ وَ نُسُکِیۡ وَ مَحۡیَایَ وَ مَمَاتِیۡ لِلّٰہِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۱۶۲﴾ۙ

বল, ‘নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব’। আল-বায়ান

বল, আমার নামায, আমার যাবতীয় ‘ইবাদাত, আমার জীবন, আমার মরণ (সব কিছুই) বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই (নিবেদিত)। তাইসিরুল

তুমি বলে দাওঃ আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সব কিছু সারা জাহানের রাব্ব আল্লাহর জন্য। মুজিবুর রহমান

১৬২. বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।(১)

(১) এখানে نسك শব্দের অর্থ কুরবানী। হজের ক্রিয়াকর্মকেও نسك বলা হয়। মুজাহিদ বলেন, نسك বলতে সে প্রাণীকে বুঝায় যা হজ বা উমরাতে যবেহ করা হয়। [তাবারী] তবে এ শব্দটি সাধারণ ইবাদাত-উপাসনার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তাই ناسك শব্দটি عابد বা ইবাদাতকারী অর্থেও বলা হয়। [কুরতুবী] আয়াতে এ সবকটি অর্থই নেয়া যেতে পারে। মুফাসসিরীন সাহাবা ও তাবেয়ীগণের কাছ থেকেও এসব তাফসীর বর্ণিত রয়েছে। তবে এখানে সাধারণ ইবাদাত অর্থ নেয়াই অধিক সঙ্গত মনে হয়। আয়াতের অর্থ এই যে, আমার সালাত, আমার সমগ্র ইবাদাত, আমার জীবন, আমার মরণ- সবই বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নিবেদিত। এখানে দ্বীনের শাখাগত কাজকর্মের মধ্যে প্রথমে সালাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, এটি যাবতীয় সৎকর্মের প্রাণ ও দ্বীনের স্তম্ভ। এরপর অন্যান্য সব কাজ ও ইবাদাত সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর সমগ্র জীবনের কাজকর্ম ও অবস্থা এবং সবশেষে মরণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, আমার এ সবকিছুই একমাত্র বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নিবেদিত- যার কোন শরীক নেই। এটিই হচ্ছে পূর্ণ বিশ্বাস ও পূর্ণ আন্তরিকতার ফল। মানুষ জীবনের প্রতিটি কাজে ও প্রতিটি অবস্থায় এ কথা মনে রাখবে যে, আমার এবং সমগ্র বিশ্বের একজন পালনকর্তা আছেন, আমি তার দাস এবং সর্বদা তার দৃষ্টিতে রয়েছি।

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৬২) বল, ‘নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার উপাসনা (কুরবানী), আমার জীবন ও আমার মরণ, বিশ্ব-জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আন'আম
৬:১৬৩ لَا شَرِیۡکَ لَہٗ ۚ وَ بِذٰلِکَ اُمِرۡتُ وَ اَنَا اَوَّلُ الۡمُسۡلِمِیۡنَ ﴿۱۶۳﴾

‘তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আর আমি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম’। আল-বায়ান

তাঁর কোন শরীক নেই, আমাকে এরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর আমিই সর্বপ্রথম আত্মসমর্পণকারী। তাইসিরুল

তাঁর কোন শরীক নেই, আমি এর জন্য আদিষ্ট হয়েছি, আর মুসলিমদের মধ্যে আমিই হলাম প্রথম। মুজিবুর রহমান

১৬৩. তার কোন শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে(১) এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।

(১) অর্থাৎ আমাকে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এরূপ ঘোষণা করার এবং আন্তরিকতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর আমি সর্বপ্রথম অনুগত মুসলিম। উদ্দেশ্য এই যে, এ উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম মুসলিম আমি। [আত-তাফসীরুস সহীহ] কেননা, প্রত্যেক উম্মতের সর্বপ্রথম মুসলিম স্বয়ং ঐ নবীই হন, যার প্রতি ওহী নাযিল করা হয়। আর প্রত্যেক নবীর দ্বীনই ছিল ইসলাম। [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৬৩) তাঁর কোন অংশী নেই এবং আমি এ সম্বন্ধেই আদিষ্ট হয়েছি। আর আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)দের মধ্যে আমিই প্রথম।’ [1]

[1] তাওহীদে উলূহিয়্যাত তথা আল্লাহর একত্বতার দাওয়াত সকল নবীরা দিয়েছেন। এখানেও শেষ নবীর পবিত্র জবান দ্বারা ঘোষণা করানো হচ্ছে যে, ‘‘আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি আত্মসমর্পণকারী মুসলিমদের প্রথম।’’ অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমার পূর্বে যে রসূলই আমি প্রেরণ করেছি, তাঁকে এই আদেশই করেছি যে, আমি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই। অতএব, তোমরা আমারই ইবাদত কর।’’ (সূরা আম্বিয়াঃ ২৫) নূহ (আঃ)ও এই ঘোষণা দিয়েছেন, {وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ} অর্থাৎ, আমাকে হুকুম করা হয়েছে যে, আমি যেন আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)-দের অন্তর্ভুক্ত থাকি. (সূরা ইউনুস ৭২) ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে এসেছে যে, যখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে বললেন, أَسْلِمْ (আত্মসমর্পণ কর।), তখন তিনি বললেন, {أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِيْنَ} বিশ্ব-জগতের প্রতিপালকের কাছে আমি আত্মসমর্পণ করলাম।’’ (সূরা বাক্বারাহ ১৩১) ইবরাহীম এবং ইয়াকূব عليهما السلام তাঁদের সন্তানদের অসিয়ত করেছিলেন, {فَلاَ تَمُوْتُنَّ إِلاَّ وَأَنْتُمْ مُّسْلِمُوْنَ} অর্থাৎ, আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) না হয়ে তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা বাক্বারাহ ১৩২) ইউসুফ (আঃ) দু’আ করেছিলেন, {تَوَفَّنِيْ مُسْلِمًا} অর্থাৎ, তুমি আমাকে আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) হিসাবে মৃত্যু দান করো। (সূরা ইউসুফ ১০১) মূসা (আঃ) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, {فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوْا إِنْ كُنْتُمْ مُّسْلِمِيْنَ} অর্থাৎ, তাঁরই উপর ভরসা কর; যদি তোমরা মুসলিম হও। (সূরা ইউনুস ৮৪) ঈসা (আঃ)-এর সহচররা বলেছিলেন, {وَاشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُوْنَ} অর্থাৎ, তুমি সাক্ষী থাক যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)। (সূরা মাইদাহ ১১১) এইভাবে সকল নবী ও তাঁদের নিষ্ঠাবান অনুসারীরা এই ইসলামকেই গ্রহণ করেছিল, যাতে তাওহীদে উলূহিয়্যাতই ছিল মৌলিক বিষয়, যদিও কোন কোন বিধি-বিধান একে অপর থেকে ভিন্ন ছিল।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আ'রাফ
৭:১৯০ فَلَمَّاۤ اٰتٰہُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَہٗ شُرَکَآءَ فِیۡمَاۤ اٰتٰہُمَا ۚ فَتَعٰلَی اللّٰہُ عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ ﴿۱۹۰﴾

অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে এক সুসন্তান দান করলেন, তখন তাদেরকে তিনি যা প্রদান করেছেন সে বিষয়ে তারা তাঁর বহু শরীক নির্ধারণ করল। বস্তুত তারা যাদের শরীক করে তাদের থেকে আল্লাহ অনেক ঊর্ধ্বে। আল-বায়ান

যখন তিনি তাদেরকে সর্বাঙ্গ-সুন্দর সন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে যা দেয়া হয় তাতে অন্যকে আল্লাহর শরীক গণ্য করে। তারা যাদেরকে শরীক গণ্য করে আল্লাহ তাদের থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। তাইসিরুল

অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে সৎ ও সুস্থ সন্তান দান করেন তখন তারা আল্লাহর দেয়া এই দানে অংশী স্থাপন করে, কিন্তু তারা যাকে অংশী করে আল্লাহ তার অনেক উর্ধ্বে। মুজিবুর রহমান

১৯০. অতঃপর তিনি (আল্লাহ) যখন তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সুসন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে তিনি যা দিয়েছেন সেটাতে আল্লাহ্‌র বহু শরীক নির্ধারণ করে(১), বস্তুত তারা যাদেরকে (তার সাথে) শরীক করে আল্লাহ তার চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।(২)

(১) কাতাদা বলেন, হাসান বসরী বলতেন, এর দ্বারা ইয়াহুদী ও নাসারাদের উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। আল্লাহ্‌ তা’আলা তাদেরকে সন্তান-সন্তুতি দান করেন, কিন্তু তারা সেগুলোকে ইয়াহুদী কিংবা নাসারা বানিয়ে ছাড়ে। [তাবারী; ইবন কাসীর]


(২)  ইয়াহুদী ও নাসারা ছাড়াও বাস্তবে যারাই আল্লাহর দেয়া নেয়ামতকে অন্যের জন্য নির্দিষ্ট করে তারাও এ আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হতে পারে। কারণ মহান সৃষ্টিকর্তা সর্বশক্তিমান আল্লাহই সর্বপ্রথম মানব জাতিকে সৃষ্টি করেন। মুশরিকরাও এ কথা অস্বীকার করে না। তারপর পরবর্তী কালের প্রত্যেকটি মানুষকেও তিনি অস্তিত্ব দান করেন। আর একথাটিও মুশরিকরা জানে। তাই দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় সুস্থ, সবল ও নিখুঁত অবয়বধারী শিশু ভূমিষ্ঠ হবার ব্যাপারে আল্লাহর উপরই পূর্ণ ভরসা করা হয়।

কিন্তু সেই আশা পূর্ণ হয়ে যদি চাঁদের মত ফুটফুটে সুন্দর শিশু ভূমিষ্ঠ হয়, তাহলেও জাহেলী কর্মকাণ্ড নবতর রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে কোন দেবী, অবতার, অলী ও পীরের নামে নজরানা ও শিন্নি নিবেদন করা হয় এবং শিশুকে এমন সব নামে অভিহিত করা হয় যেন মনে হয় সে আল্লাহর নয়, বরং অন্য কারোর অনুগ্রহের ফল। যেমন তার নামকরণ করা হয় হোসাইন বখশ, (হোসাইনের দান) পীর বখশ (পীরের দান), আব্দুর রাসূল (রাসূলের দাস), আবদুল উযযা (উযযার দাস), আবদে শামস (সূর্য দেবতার দাস) ইত্যাদি, ইত্যাদি।

আরবের মুশরিক সম্প্রদায়ের অপরাধ ছিল এই যে, তারা সুস্থ, সবল ও পূর্ণ অবয়ব সম্পন্ন সন্তান জন্মের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করতো কিন্তু সন্তানের জন্মের পর আল্লাহর এ দানে অন্যদেরকে অংশীদার করতো। নিঃসন্দেহে তাদের এ অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। কিন্তু বর্তমানে তাওহীদের দাবীদারদের মধ্যে আমরা যে শির্কের চেহারা দেখছি তা তার চাইতেও খারাপ।

এ তাওহীদের তথাকথিত দাবীদাররা সন্তানও চায় আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের কাছে। গর্ভ সঞ্চারের পর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের নামে মানত মানে এবং সন্তান জন্মের পর তাদেরই আস্তানায় গিয়ে নজরানা নিবেদন করে। এরপরও জাহেলী যুগের আরবরাই কেবল মুশরিক, আর এরা নাকি পাক্কা তাওহীদবাদী!

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯০) সুতরাং তিনি যখন তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে যা দেওয়া হয়, সে সম্বন্ধে আল্লাহর অংশী করে।[1] কিন্তু তারা যাকে অংশী করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক ঊর্ধ্বে।

[1] এখানে শরীক করার অর্থ এমন নামকরণ করা, যাতে শিরক হয়; যেমন ইমাম বখশ, গোলাম পীর, আব্দুর রসূল, বান্দা (বন্দে) আলী ইত্যাদি। যাতে প্রকাশ হয় যে, এই সন্তান অমুক সাহেবের দান অথবা তার দাস। ‘নাউযু বিল্লাহি মিন যালিক।’ অথবা এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, আমি অমুক পীরের মাযারে গিয়েছিলাম, আর সেখান থেকেই এই সন্তান লাভ হয়েছে। অথবা সন্তান লাভের পর কোন মৃত ব্যক্তির নামে নযর-নিয়ায দেওয়া। অথবা সন্তানকে কোন মাযারে নিয়ে গিয়ে তার মাথা সেখানে ঠেকানো; এই ধারণায় যে, তারই বর্কতেই এই সন্তান হয়েছে। এই সকল কর্মই আল্লাহর সাথে শরীক করার পর্যায়ভুক্ত; যা দুর্ভাগ্যক্রমে মুসলিম জনসাধারণের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছে। পরবর্তী আয়াতে মহান আল্লাহ শিরকের খন্ডন করেছেন।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আ'রাফ
৭:১৯১ اَیُشۡرِکُوۡنَ مَا لَا یَخۡلُقُ شَیۡئًا وَّ ہُمۡ یُخۡلَقُوۡنَ ﴿۱۹۱﴾۫ۖ

তারা কি এমন কিছুকে শরীক করে, যারা কোন কিছু সৃষ্টি করে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়? আল-বায়ান

তারা কি এমন কিছুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে। তাইসিরুল

তারা কি এমন বস্তুকে (আল্লাহর সাথে) অংশী করে যারা কোন বস্তুই সৃষ্টি করেনা, বরং তারা নিজেরাই (আল্লাহর দ্বারা) সৃষ্ট? মুজিবুর রহমান

১৯১. তারা কি এমন বস্তুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং ওরা নিজেরাই সৃষ্ট(১)

(১) এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঐ সমস্ত লোকদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করছেন, যার আল্লাহর সাথে মূর্তি, দেব-দেবী ইত্যাদিকে শরীক করে। অথচ তারা সৃষ্ট, মানুষের হাতের তৈরী। তারা কিছুরই মালিক নয়। ক্ষতি কিংবা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। উপাসনাকারীদের পক্ষে প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও তাদের নেই। বরং এগুলো হচ্ছে, মৃত। নড়াচড়া কিংবা শোনা বা দেখার ক্ষমতাও তাদের নেই। বরং উপাসনাকারীরা এগুলোর চেয়ে বেশী শক্তিশালী; কারণ তাদের চোখ আছে, কান আছে, তারা পাকড়াও করার ক্ষমতা রাখে। তাহলে তোমরা কিভাবে তাদের ইবাদত করছ যারা কোন কিছুই সৃষ্টি করেনি? কোন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতাও যাদের নেই? [ইবন কাসীর]

অন্য আয়াতেও আল্লাহ্ তা'আলা অনুরূপ বলেছেন, “হে মানুষ! একটি উপমা দেয়া হচ্ছে, মনোযোগের সাথে তা শোন: তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্র হলেও। এবং মাছি যদি কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের কাছ থেকে, এটাও তারা তার কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষনকারী ও অন্বেষনকৃত কতই না দুর্বল; তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি যেমন মর্যাদা দেয়া উচিত ছিল, আল্লাহ নিশ্চয় ক্ষমতাবান, পরাক্রমশালী। [সূরা হজ-৭৩–৭৪] আল্লাহ বলেন, যে, তাদের উপাস্যগুলো সবাই একত্রিত হলেও কোন একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না। বরং যদি মাছি এ সমস্ত উপাস্যদের কোন নিকৃষ্ট খাবার নিয়ে উড়ে চলে যায়, তারা সেটাও মাছির কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। যার অবস্থা হচ্ছে এই, রিযক কিংবা সাহায্য লাভের জন্য কিভাবে ইবাদত তার করা হবে? [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯১) তারা কি এমন বস্তুকে অংশী-স্থাপন করে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং ওরা নিজেরাই সৃষ্ট।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আল-আ'রাফ
৭:১৯২ وَ لَا یَسۡتَطِیۡعُوۡنَ لَہُمۡ نَصۡرًا وَّ لَاۤ اَنۡفُسَہُمۡ یَنۡصُرُوۡنَ ﴿۱۹۲﴾

আর তারা তাদেরকে কোন সাহায্য করতে পারে না এবং তারা নিজদেরকেও সাহায্য করতে পারে না। আল-বায়ান

তারা না পারে তাদেরকে (অর্থাৎ তাদের ‘ইবাদাতকারীদেরকে) সাহায্য করতে, না পারে নিজেদেরকে সাহায্য করতে। তাইসিরুল

তারা যেমন তাদের কোন সাহায্য করার ক্ষমতা রাখেনা, তেমনি নিজেরাও কোন সাহায্য করতে পারেনা। মুজিবুর রহমান

১৯২. ওরা না তাদেরকে সাহায্য করতে পারে আর না নিজেদের সাহায্য করতে পারে।(১)

(১) এমনকি কেউ তাদের ক্ষতি করতে চাইলেও তারা নিজেদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করতে পারবে না। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এ সমস্ত মা’বুদদেরকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিলেন এবং এ বিষয়টি নিয়ে মুশরিকদের উপাস্যদেরকে অপমান করতে ছাড়েন নি। আল্লাহ বলেন, “তারপর ইবরাহীম তাদের উপর সবলে আঘাত হানলেন [সূরা আস-সাফফাত: ৯৩] আরও বলেন, “তারপর তিনি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন মূর্তিগুলোকে, তাদের প্রধানটি ছাড়া ; যাতে তারা তার দিকে ফিরে আসে। [সূরা আল-আম্বিয়া: ৫৮] [ইবন কাসীর]

তাফসীরে জাকারিয়া

(১৯২) ওরা তাদের কোন প্রকার সাহায্য করতে পারে না এবং ওদের নিজেদেরও নয়।

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
আত-তাওবা
৯:৩০ وَ قَالَتِ الۡیَہُوۡدُ عُزَیۡرُۨ ابۡنُ اللّٰہِ وَ قَالَتِ النَّصٰرَی الۡمَسِیۡحُ ابۡنُ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکَ قَوۡلُہُمۡ بِاَفۡوَاہِہِمۡ ۚ یُضَاہِـُٔوۡنَ قَوۡلَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡ قَبۡلُ ؕ قٰتَلَہُمُ اللّٰہُ ۚ۫ اَنّٰی یُؤۡفَکُوۡنَ ﴿۳۰﴾

আর ইয়াহূদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে, মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা, তারা সেসব লোকের কথার অনুরূপ বলছে যারা ইতঃপূর্বে কুফরী করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, কোথায় ফেরানো হচ্ছে এদেরকে? আল-বায়ান

ইয়াহূদীরা বলে, ‘উযায়র আল্লাহর পুত্র। আর নাসারারা বলে, ‘মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এসব তাদের মুখের কথা। এতে তারা তাদের পূর্বেকার কাফিরদের কথারই অনুকরণ করে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! কেমনভাবে তারা সত্য পথ থেকে দূরে ছিটকে পড়েছে। তাইসিরুল

ইয়াহুদীরা বলেঃ উযায়ের আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলেঃ মাসীহ্ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা মাত্র (বাস্তবে তা কিছুই নয়), তারাতো তাদের মতই কথা বলছে যারা তাদের পূর্বে কাফির হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! তারা উল্টা কোন দিকে যাচ্ছে! মুজিবুর রহমান

৩০. আর ইয়াহুদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র(১), এবং নাসারারা বলে, মসীহ আল্লাহর পুত্র এটা তাদের মুখের কথা। আগে যারা কুফরী করেছিল তারা তাদের মত কথা বলে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। কোন দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে!(২)

(১) আয়াতের ভাষ্য হতে বুঝা যায় যে, ইয়াহুদীদের সবাই এ কথা বলেছিল। কারও কারও মতে, এটি ইয়াহুদীদের এক গোষ্ঠী বলেছিল। সমস্ত ইয়াহুদীদের আকীদা বিশ্বাস নয়। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর] কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, সাল্লাম ইবন মিশকাম, নুমান ইবন আওফা, শাস ইবন কায়স ও মালেক ইবনুস সাইফ তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, আমরা কিভাবে আপনার অনুসরণ করতে পারি, অথচ আপনি আমাদের কেবলা ত্যাগ করেছেন, আপনি উযায়েরকে আল্লাহর পুত্র বলে মেনে নেন না? তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করলেন। [তাবারী; সীরাতে ইবন হিশাম ১/৫৭০]

উযায়ের সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, ইয়াহুদীরা যখন তাওরাত হারিয়ে ফেলেছিল তখন উযায়ের সেটা তার মুখস্থ থেকে পুণরায় জানিয়ে দিয়েছিল। তাই তাদের মনে হলো যে, এটা আল্লাহর পুত্র হবে, না হয় কিভাবে এটা করতে পারল। [সা’দী; কুরতুবী; ইবন কাসীর] এটা নিঃসন্দেহে একটি মিথ্যা কথা যে, উযায়ের তাদেরকে মূল তাওরাত তার মুখস্থ শক্তি দিয়ে এনে দিয়েছিল। কারণ উযায়ের কোন নবী হিসেবেও আমাদের কাছে প্রমাণিত হয়নি। এর মাধ্যমে ইয়াহুদীরা তাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু সেটা তাদের দাবী মাত্র। ঐতিহাসিকভাবে এমন কিছু প্রমাণিত হয়নি। [দেখুন, ড. সাউদ ইবন আবদুল আযীয, দিরাসাতুন ফিল আদইয়ান- আল-ইয়াহুদিয়াহ ওয়ান নাসরানিয়্যাহ]


(২) এ আয়াতটি হলো পূর্বের আয়াতের ব্যাখ্যা। পূর্বে আয়াতে মোটামুটিভাবে বলা হয় যে, তারা আল্লাহর উপর ঈমান রাখে না। এখানে তার ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয় যে, ইহুদীরা উযাইরকে আর নাসারারা ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করে। [ইবন কাসীর] তাই তাদের ঈমান ও তাওহীদের দাবী নিরর্থক। এরপর বলা হয়ঃ “এটি তাদের মুখের কথা”। এর অর্থ তারা মুখে যে কুফর উক্তি করে যাচ্ছে তার পেছনে না কোন দলীল আছে, না কোন যুক্তি। কত মারাত্মক সে উক্তি যা তারা করে যাচ্ছে। অন্য আয়াতেও আল্লাহ তা বলেছেন, “এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও ছিল না। তাদের মুখ থেকে বের হওয়া বাক্য কী সাংঘাতিক। তারা তো শুধু মিথ্যাই বলে।” [সূরা আল-কাহাফ: ৫]

অতঃপর বলা হয়ঃ এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে, আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন। এরা কোন উল্টা পথে চলে যাচ্ছে। [ইবন কাসীর] এর অর্থ হল ইয়াহুদী ও নাসারারা নবীগণকে আল্লাহর পুত্র বলে পুর্ববর্তী কাফের ও মুশরিকদের মতই হয়ে গেল, তারা ফেরেশতা ও লাত মানাত মূর্তিদ্বয়কে আল্লাহর কন্যা সাব্যস্ত করেছিল। [বাগভী]

তাফসীরে জাকারিয়া

(৩০) আর ইয়াহুদীরা বলে, ‘উযাইর আল্লাহর পুত্র’ এবং খ্রিষ্টানরা বলে, ‘মসীহ আল্লাহর পুত্র।’ এটা তাদের মুখের কথা মাত্র (বাস্তবে তা কিছুই নয়)। তারা তো তাদের মতই কথা বলছে, যারা তাদের পূর্বে অবিশ্বাস করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন, তারা উল্টা কোন্ দিকে যাচ্ছে!

-

তাফসীরে আহসানুল বায়ান
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ২০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৮২ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 5 পরের পাতা »