আল-ফিকহুল আকবর আল-ফিকহুল আকবারের বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)
২. ৬. ৪. তাকদীরে বিশ্বাসের গুরুত্ব ও উপকারিতা

ইসলামী তাকদীরে বিশ্বাস ও অনৈসলামিক ভাগ্যে বিশ্বাসকে অনেক সময় এক করে ফেলা হয়। অনেকে মনে করেন ভাগ্য অনুসারেই যখন সবকিছু হবে তখন কর্মের কি দরকার। আমরা দেখলাম যে, এ সকল চিন্তা ওহীর বিকৃতি ও যুক্তি-তর্ক ভিত্তিক ‘ধারণা’ মাত্র।

যে অবিশ্বাসী তাকদীর নিয়ে বিবাদ করে, তাকদীরের দোহাই দিয়ে কর্ম ছেড়ে দেয়, সে মূলত নিজেকে আল্লাহর কর্মের পরিদর্শক ও বিচারক নিয়োগ করেছে। সে বলতে চায়, কর্ম করা আমার দায়িত্ব নয়, আমার কাজ আল্লাহর কাজের বিচার করা।

আর মুমিনের বিশ্বাস, আল্লাহর কর্মের বিচার করা মানুষের কর্ম নয়। তিনি কি জানেন, কি লিখেছেন, কি মুছেন আর কি রেখে দেন কিছুই মানুষকে জানান নি। কারণ, এসব জানা মানুষের কোনো কল্যাণে আসবে না। সবকিছুই তাঁর মহান রুবূবিয়্যাতের অংশ। মানুষের দায়িত্ব আল্লাহর রহমত ও ন্যায়পরায়ণতার উপরে আস্থা রেখে আল্লাহর নির্দেশ মত কর্ম করা, ফলাফলের জন্য উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা মনে স্থান না দেওয়া। ইসলামের তাকদীরে বিশ্বাস মুসলিমকে কর্মমূখী করে তোলে, কখনই কর্মবিমূখ করে না। তাকদীরে বিশ্বাসের ফলে মানুষ সকল হতাশা, অবসাদ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পায়। মুসলিম জানে যে, তার দায়িত্ব কর্ম করা, ফলাফলের জন্য দুশ্চিন্তা বা উৎকণ্ঠা তার জীবনে অর্থহীন, কারণ ফলাফলের দায়িত্ব এমন এক সত্তার হাতে যিনি তাকে তার নিজের চেয়েও ভাল জানেন, ভালবাসেন, যিনি দয়াময়, যিনি কাউকে জুলুম করেন না। যিনি তাঁর বান্দাকে কর্মের চেয়ে বেশি পুরস্কার দিতে চান। তাই মুমিন উৎকণ্ঠা মুক্ত হয়ে কর্ম করেন।

তাক্দীরের বিশ্বাস মুসলিমকে অহংকার, অতিউল্লাস ও হতাশা থেকে রক্ষা করে। তার জীবনে সফলতা বা নিয়ামত আসলে সে অহংকারী হয়ে উঠে না। সে জানে আল্লাহর ইচ্ছায় ও রহমতেই সে সফলতা লাভ করেছে। তার হৃদয় কানায় কানায় ভরে ওঠে কৃতজ্ঞতায়। কৃতজ্ঞ হৃদয় আর অহংকারী হৃদয়ের মধ্যে রয়েছে মানবিক ও পাশবিক হৃদয়ের পার্থক্য।

অপরদিকে মুমিন ব্যর্থতা বা পরাজয়ে হতাশ হয় না। সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর ইচ্ছা ও জ্ঞান অনুযায়ী সে ফল পেয়েছে, নিশ্চয় এর মধ্যে কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে। সে জানে যে, তার প্রচেষ্টা ও কর্মের জন্য সে অবশ্যই আল্লাহর কাছে পুরস্কার লাভ করবে। কাজেই সে হতাশ না হয়ে নিজের কর্মের ভুল দূর করে আল্লাহর নির্দেশ মত চেষ্টা করতে থাকে, ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর উপর ছেড়ে দেয়।

তাকদীরে বিশ্বাসের ফল আমরা দেখতে পাই এ বিশ্বাস সর্বপ্রথম যাদের জীবনে এসেছিল: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীগণের জীবনে। আমরা দেখেছি তাকদীরের উপর সবচেয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর, আর তাই তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশি দৃঢ়প্রত্যয়ী কর্মবীর। তিনি তাঁর সাধ্যমত কর্ম করেছেন, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন এবং ফলাফলের ভার ছেড়ে দিয়েছেন তাঁর প্রতিপালকের কাছে। ঠিক তেমনি অকুতোভয় দৃঢ়প্রত্যয়ী কর্মবীর ছিলেন তাঁর সাহাবীগণ, তাক্দীরে বিশ্বাস তাঁদের সকল সংশয়, ভয়, দুশ্চিন্তা দূর করে বিশ্বজয়ে প্রেরণা জুগিয়েছে।

এ বিশ্বাসের জন্যই অতি নগণ্য সংখ্যক বিশ্বাসী মুসলিম বিপুল সংখ্যক অবিশ্বাসীর বিরুদ্ধে অকুতোভয়ে দাঁড়াতে পেরেছেন। এরূপ অকুতোভয় শক্তিশালী তাকদীরে বিশ্বাসী কর্মবীর মুমিনকে আল্লাহ ভালবাসেন, যার তাকদীরে বিশ্বাস তাকে পরাজয়ের হতাশা, হা-হুতাশ ও গ্লানি থেকে রক্ষা করে। অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে যিনি হা-হুতাশ করেন না, আবার ভবিষ্যত পরাজয়ের দুশ্চিন্তাও তাকে দ্বিধান্বিত করতে পারে না। বরং সকল পরাজয় পায়ে দলে তাকদীরের বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে তিনি সামনে এগিয়ে যান। আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:


الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ وَفِي كُلٍّ خَيْرٌ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلا تَعْجَزْ وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ فَلا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا وَلَكِنْ قُلْ قَدَرُ اللَّهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ فَإِنَّ لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ


‘‘শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকট দূর্বল মুমিন থেকে বেশি প্রিয় ও বেশি ভাল, তবে তাদের উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। তোমার যাতে মঙ্গল রয়েছে সে বিষয়ে সচেষ্ট হও এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর। অক্ষম বা হতাশ হয়ো না। যদি তোমার কিছু হয় (যদি তুমি আশানুরূপ ফল না পাও বা ব্যর্থ হও) তবে কখনো বলবে না: হায়, যদি আমি অমুক বা তমুক কাজ করতাম তাহলে হয়ত এরূপ হতো.. (অতীতের ব্যার্থতা নিয়ে হা-হুতাশ করবে না) বরং (তাকদীরের বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে) বলবে: আল্লাহর তাকদীরে যা ছিল হয়েছে, আল্লাহর যা মর্জি হয়েছে তাই করেছেন। কারণ, ‘‘যদি ঐ কাজ করতাম তবে হয়ত এরূপ হতো’’-এ ধরনের কথা শয়তানের দরজা খুলে দেয়।’’[1]

তাক্দীরে বিশ্বাস হৃদয়ের দরজা শয়তানের জন্য বন্ধ করে দেয়। সেখানে শয়তান হতাশা বা অবসাদের বীজ বপন করতে পারে না।

[1] মুসলিম, আস-সহীহ ৪/২০৫২ (কিতাবুল কাদর, বাবুল আমরি বিল কুওয়াতি)।