ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম ঈমান শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ)
প্রশ্ন: (৬৬) মানুষের ওপর কি বদ নজর লাগে? লাগলে তার চিকিৎসা কী? এ থেকে বেঁচে থাকা কি আল্লাহর ওপর ভরসার পরিপন্থী?

উত্তর: বদ নজরের প্রভাব সত্য। আল্লাহ বলেন,

﴿وَإِن يَكَادُ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ لَيُزۡلِقُونَكَ بِأَبۡصَٰرِهِمۡ﴾ [القلم: ٥١]

“কাফেরেরা তাদের দৃষ্টির মাধ্যমে আপনাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দিতে চায়।” [সূরা আল-ক্বলম, আয়াত: ৫১]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الْعَيْنُ حَقٌّ وَلَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابَقَ الْقَدَرَ سَبَقَتْهُ الْعَيْنُ وَإِذَا اسْتُغْسِلْتُمْ فَاغْسِلُوا»

“বদ নজরের প্রভাব সত্য। কোনো জিনিস যদি তাকদীরকে অতিক্রম করতে পারত, তাহলে বদ নজর তাকে অতিক্রম করত। তোমাদেরকে গোসল করতে বলা হলে তোমরা গোসল করবে এবং গোসলে ব্যবহৃত পানি দিয়ে রোগীর চিকিৎসা করবে।”[1]

নাসাঈ এবং ইবন মাজাহতে বর্ণিত আছে যে, একদা আমের ইবন রাবিয়া সাহল ইবন হুনাইফের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলেন। সাহল ইবন হুনাইফ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তখন গোসল করতে ছিলেন। আমের ইবন রাবীয়া সাহলকে দেখে বলল, আমি আজকের মত লুকায়িত সুন্দর চামড়া আর কখনো দেখি নি। এ কথা বলার কিছুক্ষণ পর সাহ্ল অসুস্থ হয়ে পড়ে গেল। তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে এসে বলা হলো, সাহল বদ নজরে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি বললেন, তোমরা কাকে সন্দেহ করছ? তারা বলল, আমের ইবন রাবীয়াকে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেন তোমাদের কেউ তার ভাইকে হত্যা করতে চায়। কেউ যদি কারো মধ্যে ভালো কিছু দেখে, তাহলে সে যেন তার জন্য ভাই এর কল্যাণ কামনা করে এবং দো‘আ করে। অতঃপর তিনি পানি আনতে বললেন এবং আমেরকে অযু করতে বললেন। অযুতে মুখমণ্ডল, কনুইসহ উভয় হাত এবং হাটু পর্যন্ত এমনকি লুঙ্গীর নীচ পর্যন্ত ধৌত করে সাহলের শরীরে ঢালতে বললেন।[2] কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায় পানির পাত্র যেন পেছন থেকে ঢালে। এটি বাস্তব ঘটনা, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

বদ নজরে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসা হলো:

(১) হাদীসে বর্ণিত দো‘আগুলো পাঠ করে আক্রান্ত রোগীর উপর ঝাড়-ফুঁক করতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لَا رُقْيَةَ إِلَّا مِنْ عَيْنٍ أَوْ حُمَةٍ»

“বদ নজর এবং বিচ্ছুর বিষ নামানোর ঝাঁড়-ফুঁক ব্যতীত কোনো ঝাড়-ফুঁক নেই।”[3]

জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ দো‘আর মাধ্যমে ঝাড়তেন,

«بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ»

“আমি আপনাকে আল্লাহর নামে ঝাড়-ফুঁক করছি প্রতিটি এমন জিনিস হতে, যা আপনাকে কষ্ট দেয় এবং প্রত্যেক জীবের অমঙ্গল হতে ও হিংসুকের বদ নজর হতে আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। আমি আপনাকে আল্লাহর নামে ঝাড়-ফুঁক করছি।”[4]

(২) যার বদ নজর লাগছে বলে সন্দেহ করা হয়, তাকে গোসল করিয়ে গোসলের পানি রোগীর শরীরে ঢালতে হবে। যেমনভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমের ইবন রাবীয়াকে গোসল করতে বলেছিলেন। সন্দেহ যুক্ত ব্যক্তির পেশাব-পায়খানা বা অন্য কোনো কিছু দিয়ে চিকিৎসা করার কোনো দলীল নেই। অনুরূপভাবে তার উচ্ছিষ্ট বা অযুর পানি ইত্যাদি ব্যবহার করাও ভিত্তিহীন। হাদীসে যা পাওয়া যায় তা হলো তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং লুঙ্গির নিচের অংশ ধৌত করা এবং সম্ভবতঃ মাথার টুপি, পাগড়ী বা পরিধেয় কাপড়ের নিচের অংশ ধৌত করা এবং তা ব্যবহার করাও বৈধতার অন্তর্ভুক্ত হবে।

বদ নজর লাগার আগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়াতে কোনো দোষ নেই। এটা আল্লাহর ওপর ভরসা করার পরিপন্থীও নয়। কারণ, আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণভাবে ভরসার স্বরূপ হলো বান্দা বৈধ উপকরণ অবলম্বন করে বদনজর ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে এবং সেই সাথে আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান-হুসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে এ বাক্যগুলো দিয়ে ঝাড়-ফুঁক করতেন:

«أُعِيْذُكُماَ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ»

“আমি আল্লাহর কাছে তাঁর পরিপূর্ণ বাক্যের মাধ্যমে প্রতিটি শয়তান এবং বিষধর বস্তু ও কষ্ট দায়ক নযর হতে তোমাদের জন্য আশ্রয় চাচ্ছি।”[5]নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার পুত্র ইসহাক এবং ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে এ দো‘আর মাধ্যমে ঝাড়-ফুক করতেন।[6]

>
[1] সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কিতাবুস্ সালাম।

[2] ইবন মাজাহ, অধ্যায়: কিতাবুত্ তিবব।

[3] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: কিতাবুত্ তিবব।

[4] সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কিতাবুস্ সালাম।

[5] আবু দাউদ, অধ্যায়: কিতাবুস সুন্নাহ।

[6] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: নবীদের হাদীস।