শির্ক কী ও কেন? প্রথম পরিচ্ছেদ ড. মুহাম্মদ মুয্‌যাম্মিল আলী
শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপাসনা

মুখের উপাসনা ছাড়াও আরো এমন কিছু উপাসনা রয়েছে যার সম্পর্ক রয়েছে পূর্ণ শরীরের সাথে। যেমন :

দাঁড়িয়ে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ করা :

আল্লাহর সম্মুখে বিনয় ও তাঁর আনুগত্য প্রকাশের জন্য তিনি মানুষের শরীরের উপর যে সব উপাসনা ধার্য করে দিয়েছেন তন্মধ্যে অন্যমত একটি উপাসনা হচ্ছে- দাঁড়িয়ে বা প্রয়োজনে বসে সালাত কায়েম করা। এ সালাত সঠিক এবং আল্লাহর নিকট তা গৃহীত হওয়ার জন্য রয়েছে তিনটি পূর্বশর্ত :

এক. আল্লাহর একান্ত ভালোবাসার আকর্ষণেই তা কায়েম করতে হবে।

দুই. অত্যন্ত আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সাথে তা সম্পাদিত হতে হবে।

তিন. আল্লাহর আনুগত্য তাঁর সম্মুখে বিনয় প্রকাশ ও তাঁর উলূহিয়্যাতের স্বীকৃতি দানের উদ্দেশ্যেই তা কায়েম করতে হবে।

যার সালাতে এ তিনটি শর্ত পাওয়া যাবে না, তার সালাত বাহ্যিক দৃষ্টিতে সালাত হিসেবে গণ্য হলেও তা আল্লাহর নিকটে গ্রাহ্য হবে না।

কেউ কাউকে অন্তর দ্বারা ভালবাসতে পারে, মনের মানুষের আগমনের সংবাদ শুনলে তাকে সাদর সম্ভাষণ জানানোর জন্যে ব্যতিব্যস্তও হতে পারে, কিন্তু তাকে ভালোবাসার আতিশয্যে তার সামনে দাঁড়িয়ে এমন কোনো বিনয়ভাব প্রকাশ বা এমন কোনো কর্ম করা যাবে না, যা বাহ্যত তার উপাসনার শামিল হয়। কেননা, এ ধরনের বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ আল্লাহ্‌ তা‘আলার জন্যেই নির্ধারিত। সেজন্য মহান আল্লাহ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশের নির্দেশ করে বলেছেন,

﴿ وَقُومُواْ لِلَّهِ قَٰنِتِينَ ٢٣٨ ﴾ [البقرة: ٢٣٨]

“তোমরা আল্লাহর জন্য বিনয় প্রকাশের উদ্দেশ্যে দাঁড়াও।’’[1]

আল্লাহর সামনে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশকে শির্ক মুক্ত রাখার জন্য তিনি তা এমন স্থানে প্রদর্শন করতে নির্দেশ করেছেন যেখানে শির্ক সংঘটিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কবরকে মসজিদ বানাতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে কোনো কবরমুখী হয়ে বা কবরের সন্নিকটে সালাত আদায় করতেও নিষেধ করেছেন; কেননা, এতে আল্লাহর প্রতি বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশের পাশাপাশি কবরবাসী নবী বা অলিরও বিনয় এবং আনুগত্য প্রকাশিত হতে পারে। যেহেতু দাঁড়িয়ে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ আল্লাহর উপাসনা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারিত, সেহেতু কোনো পীর-মাশায়েখ, বা কোনো অলি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামনে বা তাদের ছবি, প্রতিকৃতি, কবর, ভাস্কর্য বা স্মৃতিসৌধের পার্শ্বে তাঁদের সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নীরবে দাঁড়ানো যাবে না; কেননা, এতে আল্লাহ তা‘আলার সামনে বিনয় প্রকাশের পদ্ধতিতে তাঁদের সামনে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশিত হয়।

সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রুকূ‘ ও সেজদা করা :

আল্লাহর মহববত তাঁর সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশার্থে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে সালাত কায়েম করা যেমন আল্লাহর উপাসনা, তেমনি একই উদ্দেশ্যে আল্লাহর সামনে নত হয়ে রুকু‘ ও সেজদা করাও তাঁর উপাসনা। সে জন্য তিনি এর নির্দেশ করে বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱرۡكَعُواْ وَٱسۡجُدُواْۤ وَٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمۡ﴾ [الحج: ٧٧]

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে রুকু‘, সেজদা ও ইবাদত কর।’’[2]

আল্লাহর সামনে রুকু‘ ও সেজদা করা তাঁর উপাসনা হওয়ার কারণে কোনো পীর, মাশায়েখ ও অলির সম্মানার্থে তাদের সামনে বা কবরে রুকু‘ ও সেজদা করা তাদের উপাসনার শামিল।

কারো সম্মানার্থে মাথা নত ও কদমবুসী করা :

কাউকে অভিবাদন জ্ঞাপন করার জন্য মাথা নত করা এবং মাতা-পিতা, অলি ও দরবেশদের সম্মান প্রদর্শনের জন্য কদমবুসী করা যদিও শির্কের পর্যায়ভুক্ত নয়, তথাপি তা করা ইসলামের অনুসৃত রীতিরও অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং তা মুসলিম সমাজে প্রচলিত পশ্চিমা ও হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিরই অন্তর্ভুক্ত বিষয়। কাজেই তা বর্জনীয়।[3]

সম্মান প্রদর্শনের জন্য সেজদা করা (السجدة للتعظيم) :

সেজদার মাধ্যমে কাউকে সম্মান প্রদর্শন করা অতীতের শরী‘আতে বৈধ ছিল[4]। ফেরেশতাদের কর্তৃক আদম আলাইহিস সালাম-কে এবং ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইদের কর্তৃক তাঁকে সেজদা করা এ সম্মান প্রদর্শনেরই অন্তর্গত। তবে কোনো সৃষ্টিকে এ ধরনের সম্মান প্রদর্শনের রীতি সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত শরী‘আত দ্বারা সম্পূর্ণভাবে রহিত হয়ে গেছে এবং সর্বশেষ শরী‘আতে তা শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যেই নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। শর‘য়ী নিয়ম মতে জ্ঞানী, গুণী ও সৎ মানুষদের সম্মান প্রদর্শনের পথ হচ্ছে- তাঁদের আগমনের সংবাদ শুনলে আমরা আনন্দের সাথে এগিয়ে গিয়ে তাঁদেরকে সাদর সম্ভাষণ জানাবো, অতিথি হিসেবে তাঁদের একরাম করবো, তাঁদের সাথে সালাম, মুসাফাহা ও আলিঙ্গন করবো, তাঁদেরকে আদর ও আপ্যায়ন করবো, তাঁদের আহ্বানে সাড়া দেব, তাঁদের উপদেশ গ্রহণ করবো, বিদায়ের সময় তাঁদেরকে কিছুদূর এগিয়ে নিয়ে সম্মানের সাথে বিদায় করে দেব।

সম্মানের জন্য কাউকে সেজদা করা যদি বৈধ হতো তা হলে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলের সাহাবীদেরকে এ মর্মে নির্দেশ প্রদান করতেন যে, তোমরা নবীকে সেজদা করার মাধ্যমে তাঁর সম্মান প্রদর্শন করো; কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলের সাহাবীদেরকে এমন কোনো নির্দেশ না দিয়ে মানুষকে সম্মান প্রদর্শনের যে পদ্ধতির কথা উপরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁকে সেভাবেই সম্মান প্রদর্শনের জন্য নির্দেশ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

﴿إِنَّآ أَرۡسَلۡنَٰكَ شَٰهِدٗا وَمُبَشِّرٗا وَنَذِيرٗا ٨ لِّتُؤۡمِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُۚ وَتُسَبِّحُوهُ بُكۡرَةٗ وَأَصِيلًا ٩ ﴾ [الفتح: ٨، ٩]

“আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারী স্বরূপ প্রেরণ করেছি; যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তাঁকে (রাসূলকে) সম্মান ও মর্যাদা দান কর, আর সকাল ও সন্ধায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর।’’[5]

একটি উট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান প্রদর্শন পূর্বক সেজদা করলে উপস্থিত সাহাবীগণ তা দেখে তাঁকে সম্মানের উদ্দেশ্যে সেজদা করতে চাইলে তিনি তাঁদেরকে তা করতে নিষেধ করে বলেন,

«اعْبُدُوا رَبَّكُمْ، وَأَكْرِمُوا أَخَاكُم»

“তোমরা তোমাদের রবের দাসত্ব কর এবং তোমাদের ভাইকে একরাম তথা সম্মান কর।’’[6]

এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কাউকে সেজদা করা তার উপাসনারই শামিল। আর উপাসনা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো করা যায়না বিধায়, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সেজদা করা যাবে না। এমন কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেও তা করার কোনো বৈধতা নেই। অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ المَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا»

“আমি যদি কাউকে সেজদা করার নির্দেশ করতাম, তাহলে স্ত্রীর প্রতি তার স্বামীকে সেজদা করার নির্দেশ করতাম।”[7]এ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী শরী‘আতে সেজদা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সম্মান ও উপাসনা প্রকাশের জন্য নির্দ্দিষ্ট একটি মাধ্যম। কেউ কারো জন্যে- তিনি যেই হোন না কেন- সেজদা করা হারাম। যে আল্লাহ তা‘আলাকে ব্যতীত অন্য কাউকে সেজদা করলো, প্রকৃতপক্ষে সে গায়রুল্লাহকেই তার উপাস্য বানিয়ে নিল। আল্লাহর উপাসনার ক্ষেত্রে সে অপরকে শরীক করে নিল।

>
[1]. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাহ : ২৩৮।

[2]. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ : ৭৭।

[3].রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ত্বা-ইফ থেকে ফেরার পথে তাঁর শত্রু উতবাহ ও শায়বাহ এর একটি আংগুরের বাগানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সে সময় তাদের দাস আদ্দাস নামের জনৈক খ্রি্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্রষ্টান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পায়ে চুম্বন করেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। দেখুন : আল-মুবারক পূরী, পৃ. ১২৬।

অনুরূপভাবে অপর একজন গ্রাম্য সাহাবী দ্বারাও এ ধরনের কদমবুসী করার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অভিবাদন, সম্মান ও ভালবাসা প্রদর্শনের জন্য তাঁর কোন অনুমোদিত পন্থা ছিল না। এ জন্য তাঁর অন্যান্য সাহাবীগণ এভাবে কোন দিন তাঁকে অভিবাদন জ্ঞাপন করেন নি। এতে প্রমাণিত হয় যে, কদমবুসীর বৈধতার ব্যাপারে যে দু‘একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায় তা একেকটি ঘটনা বিশেষ, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথেই সীমাবদ্ধ, এর দ্বারা কোন অবস্থাতেই কদমবুসী বা পা চুম্বনের অনুমোদন প্রমাণিত হয়না।- লেখক

[4] কিন্তু সেই সেজদার আকার–আকৃতি, ধরণ ও পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আসলেই কি তা মাথা মাটিতে রেখে করা হতো কি না তা জানার কোনো উপায় নেই। কারণ; সেজদা শব্দটি সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশের অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুতরাং সেটা অনেকটা অস্পষ্ট বা মুতাশাবিহ। সেটার উপর ভিত্তি করে কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট বাণী বা মুহকামের আমল বাদ দেয়া যাবে না। সুতরাং কোনোভাবেই আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারও জন্য সেজদা করাকে অনুমতিপ্রাপ্ত মনে করতে পারি না। [সম্পাদক]

[5]. আল-কুরআন, সূরা ফাতহ : ৯।

[6] উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল কতিপয় মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ছিলেন, এমন সময় একটি উট এসে তাঁকে সেজদা করলো। সাহাবীগণ তা দেখে বললেন : হে রাসুল! চতুষ্পদ জন্তু আপনাকে সেজদা করে, অথচ আমরা এর অধিক হকদার, তখন তিনি বললেন : তোমরা তোমাদের রবের ইবাদাত কর এবং তোমাদের ভাই অর্থাৎ আমাকে সম্মান কর।’’ আহমদ, প্রাগুক্ত; ৩/৩২। [(তবে এর সনদ দুর্বল), সম্পাদক]

[7] মুহাম্মদ ইবন ইয়াযীদ ইবন মা-জাঃ, প্রাগুক্ত; কিতাবুন নিকাহ, বাব: হক্কুয যাওজি ‘আলাল মারআতি (স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার); ১/৫৯৫।