ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম ছিয়াম (রোযা) শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ)
প্রশ্ন: (৪১৩) সিয়াম ভঙ্গকারী বিষয় কী কী?

উত্তর: সিয়াম ভঙ্গকারী বিষয়গুলো হচ্ছে নিম্নরূপঃ

ক) স্ত্রী সহবাস।

খ) খাদ্য গ্রহণ।

গ) পানীয় গ্রহণ।

ঘ) উত্তেজনার সাথে বীর্যপাত করা।

ঙ) খানা-পিনার অন্তর্ভুক্ত এমন কিছু গ্রহণ করা। যেমন সেলাইন ইত্যাদি।

চ) ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা।

ছ) শিঙ্গা লাগিয়ে রক্ত বের করা।

জ) হায়েয বা নেফাসের রক্ত প্রবাহিত হওয়া।

উল্লিখিত বিষয়গুলোর দলীল নিম্নরূপঃ

সহবাস ও খান-পিনা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

﴿فَٱلۡـَٰٔنَ بَٰشِرُوهُنَّ وَٱبۡتَغُواْ مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَكُمۡۚ وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ثُمَّ أَتِمُّواْ ٱلصِّيَامَ إِلَى ٱلَّيۡلِۚ﴾ [البقرة: ١٨٧]

“অতএব, এক্ষণে তোমরা (সিয়ামের রাত্রেও) তাদের সাথে সহবাস করতে পার এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা অনুসন্ধান কর এবং প্রত্যুষে (রাতের) কাল রেখা হতে (ফজরের) সাদা রেখা প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তোমরা খাও ও পান কর; অতঃপর রাত্রি সমাগম পর্যন্ত তোমরা সাওম পূর্ণ কর।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৭]

উত্তেজনার সাথে বীর্যপাত সাওম ভঙ্গের কারণ। দলীল, হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা সাওম আদায়কারীর উদ্দেশ্যে বলেন, “সে খানা-পিনা ও উত্তেজনা পরিত্যাগ করে আমারই কারণে।”[1] উত্তেজনার সাথে বীর্যপাত করার ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيَأتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرٌ قَالَ أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهَا وِزْرٌ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ كَانَ لَهُ أَجْرًا»

“স্ত্রী সঙ্গমেও তোমাদের জন্য সাদকার সাওয়াব রয়েছে। সাহাবীগণ (আশ্চর্য হয়ে) জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের একজন তার উত্তেজনার চাহিদা মেটাবে, আর এতে সাওয়াবের হকদার হবে এটা কেমন কথা? তিনি জবাবে বললেন, তোমরা কি মনে কর, সে যদি এ কাজ কোনো হারাম স্থানে করত তবে পাপের অধিকারী হত না? তেমনি হালাল স্থানে ব্যবহার করার কারণে অবশ্যই সে পুরস্কারের অধিকারী হবে।”[2] আর উত্তেজনার চাহিদা মেটানোর মাধ্যম হচ্ছে স্ববেগে বীর্য নির্গত হওয়া। এজন্য বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, মযী[3] বের হলে সিয়াম বিনষ্ট হবে না, যদিও তা উত্তেজনা, চুম্বন ও স্পর্শ করার কারণে হয়।

খানা-পিনার অন্তর্ভুক্ত এমন কিছু গ্রহণ করা সাওম ভঙ্গের কারণ। যেমন, খানা-পিনার অভাব পূর্ণ করবে এরকম সেলাইন গ্রহণ করা। কেননা ইহা যদিও সরাসরি খানা-পিনা নয় কিন্তু ইহা খানা-পিনার কাজ করে এবং তার প্রয়োজন মেটায়। একারণেই তো ইহা দ্বারা শরীরের গঠন প্রকৃতি ঠিক থাকে, খানা-পিনার অভাব অনুভব করে না।

কিন্তু খানা-পিনার কাজ করে না এরকম ইন্জেকশন গ্রহণ করলে সাওম ভঙ্গ হবে না। চাই উহা শিরার মধ্যে প্রদান করা হোক বা পেশীতে বা শরীরের যে কোনো স্থানে।

ইচ্ছাকৃত বমি করা। অর্থাৎ বমির মাধ্যমে পেটের মধ্যে যা আছে তা মুখ দিয়ে বাইরে বের করা। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ ذَرَعَهُ الْقَيْءُ فَلَيْسَ عَلَيْهِ قَضَاءٌ وَمَنِ اسْتَقَاءَ عَمْدًا فَلْيَقْضِ»

“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করবে সে যেন সাওম কাযা আদায় করে। কিন্তু অনিচ্ছাকৃত যার বমি হয় তার কোনো কাযা নেই।”[4] এর কারণ হচ্ছে, মানুষ বমি করলে তার পেট খাদ্যশুন্য হয়ে যায়। তখন তার এ শুন্যতা পূরণের প্রয়োজন পড়ে। এ কারণে আমরা বলব, সিয়াম ফরয হলে কোনো মানুষের বমি করা জায়েয নয়। কেননা বমি করলে তার ফরয সিয়াম বিনষ্ট হয়ে যাবে। তবে অসুস্থতার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হলে সাওম নষ্ট হবে না।

শিঙ্গা লাগানো। অর্থাৎ শিঙ্গা লাগানোর মাধ্যমে শরীর থেকে রক্ত বের করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, أَفْطَرَ الْحَاجِمُ وَالْمَحْجُومُ “যে ব্যক্তি শিঙ্গা লাগায় ও যার শিঙ্গা লাগানো হয় উভয়ের সাওম ভঙ্গ হয়ে যাবে।”[5]

হায়েয বা নিফাসের রক্ত প্রবাহিত হওয়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের সম্পর্কে বলেন, أَلَيْسَ إِذَا حَاضَتْ لَمْ تُصَلِّ وَلَمْ تَصُمْ “সে কি এমন নয় যে, ঋতুবতী হলে সালাত পড়ে না ও সাওমও রাখে না?”[6]

উল্লিখিত বিষয়গুলো নিম্নলিখিত তিনটি শর্তের ভিত্তিতে সাওম ভঙ্গের কারণ হিসেবে গণ্য হবে”

১. জ্ঞান থাকা।

২. স্মরণ থাকা।

৩. ইচ্ছাকৃতভাবে করা।

প্রথম শর্ত: জ্ঞান থাকা। অর্থাৎ উক্ত বিষয়ে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে শরী‘আতের বিধান সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অথবা সিয়ামের জন্য যে সময় নির্দিষ্ট সে সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা।

যদি শরী‘আতের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে তবে তার সিয়াম বিশুদ্ধ হবে। কেননা আল্লাহ বলেন, رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذنَآ إِن نَّسِينَآ أَو أَخطَأنَا “হে আমাদের রব আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুলক্রমে কোনো কিছু করে ফেলি, তবে আমাদের পাকড়াও করবেন না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮৬] আল্লাহ বলেন, আমি তাই করলাম। আল্লাহ আরো বলেন,

﴿وَلَيۡسَ عَلَيۡكُمۡ جُنَاحٞ فِيمَآ أَخۡطَأۡتُم بِهِۦ وَلَٰكِن مَّا تَعَمَّدَتۡ قُلُوبُكُمۡۚ﴾ [الاحزاب: ٥]

“ভুলক্রমে তোমরা যা করে ফেল সে সম্পর্কে তোমাদের কোনো গুনাহ্ নেই। কিন্তু তোমাদের অন্তর যার ইচ্ছা করে তার কথা ভিন্ন।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫]

সুন্নাহ থেকে সিয়ামের ক্ষেত্রে বিশেষ দলীল হচ্ছে, সহীহ হাদীসে আদী ইবন হাতেম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি সাওম রাখার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে উট বাঁধার দু‘টো রশী বালিশের নীচে রেখে দিলেন। একটি কালো রঙের অন্যটির রং সাদা। এরপর খানা-পিনা করতে থাকলেন। যখন স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সাদা ও কালো রশী চিনতে পারলেন তখন খানা-পিনা বন্ধ করলেন। সকালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে গিয়ে বিষয়টি উল্লেখ করলে তিনি তাকে বললেন, কুরআনের আয়াতে সাদা ও কালো সুতা বলতে আমাদের পরিচিত সূতা বা রশী উদ্দেশ্য নয়। এ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাদা সুতা বলতে দিনের শুভ্রতা (সুবহে সাদেক বা ফজর হওয়া) আর কালো সূতা বলতে রাতের অন্ধকার উদ্দেশ্য। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সিয়াম কাযা আদায় করার আদেশ করেন নি।[7] কেননা বিষয়টি সম্পর্কে তিনি ছিলেন অজ্ঞ। ভেবেছিলেন এটাই আয়াতের অর্থ।

আর সিয়ামের জন্য যে সময় নির্দিষ্ট সে সম্পর্কে অজ্ঞ থাকলেও তার সিয়াম বিশুদ্ধ। দলীল: সহীহ বুখারীতে আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে ইফতার করে নিয়েছিলাম। তার কিছুক্ষণ পর আবার সূর্য দেখা গিয়েছিল।” কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে উক্ত সিয়ামের কাযা আদায় করার আদেশ করেন নি। কেননা কাযা আদায় করা ওয়াজিব হলে তিনি অবশ্যই সে আদেশ প্রদান করতেন। আর সে আদেশ থাকলে আমাদের কাছেও তার বর্ণনা পৌঁছতো। কেননা আল্লাহ বলেন, إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ “নিশ্চয় আমি যিকির অবতীর্ণ করেছি আর আমিই তার সংরক্ষণকারী।” [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯] অতএব, প্রয়োজন থাকা সত্বেও যখন এক্ষেত্রে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না, তাই বুঝা যায় যে, তিনি তাদেরকে এর কাযা আদায় করার নির্দেশ প্রদান করেন নি। অতএব, অজ্ঞতাবশতঃ দিন থাকতেই পানাহার করে ফেললে তার কাযা আদায় করা ওয়াজিব নয়। জানার সাথে সাথে পানাহার থেকে বিরত থাকবে এবং দিনের বাকী অংশ সিয়াম অবস্থায় অতিবাহিত করবে।

অনুরূপভাবে কোনো লোক যদি খানা-পিনা করে এ ভেবে যে এখনও রাত আছে- ফজর হয় নি। কিন্তু পরে জানলো যে সে ফজর হওয়ার পরই পানাহার করেছে, তবে তার সিয়াম বিশুদ্ধ হবে। তাকে কাযা আদায় করতে হবে না। কেননা সে ছিল অজ্ঞ।

দ্বিতীয় শর্ত: স্মরণ থাকা। অর্থাৎ সে যে সাওম রেখেছে একথা ভুলে না যাওয়া। অতএব, সাওম রেখে ভুলক্রমে কোনো মানুষ যদি খানা-পিনা করে ফেলে, তবে তার সিয়াম বিশুদ্ধ এবং তাকে কাযা আদায় করতে হবে না। কেননা আল্লাহ বলেন, رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَآ إِن نَّسِينَآ أَوۡ أَخۡطَأۡنَاۚ “হে আমাদের রব আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুলক্রমে কোনো কিছু করে ফেলি, তবে আমাদের পাকড়াও করবেন না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮৬] আল্লাহ বলেন, আমি তাই করলাম। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ نَسِيَ وَهُوَ صَائِمٌ فَأَكَلَ أَوْ شَرِبَ فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللَّهُ وَسَقَاهُ»

“যে ব্যক্তি সাওম রেখে ভুলক্রমে পানাহার করে, সে যেন তার সিয়াম পূর্ণ করে। কেননা আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন।”[8]

তৃতীয় শর্ত: ইচ্ছাকৃত করা। অর্থাৎ সাওম আদায়কারী নিজ ইচ্ছায় উক্ত সাওম ভঙ্গের কাজে লিপ্ত হবে। অনিচ্ছাকৃতভাবে হলে তার সিয়াম বিশুদ্ধ হবে চাই তাকে জোর জবরদস্তী করা হোক বা না হোক। কেননা বাধ্য করে কুফুরীকারীকে আল্লাহ বলেন,

﴿مَن كَفَرَ بِٱللَّهِ مِنۢ بَعۡدِ إِيمَٰنِهِۦٓ إِلَّا مَنۡ أُكۡرِهَ وَقَلۡبُهُۥ مُطۡمَئِنُّۢ بِٱلۡإِيمَٰنِ وَلَٰكِن مَّن شَرَحَ بِٱلۡكُفۡرِ صَدۡرٗا فَعَلَيۡهِمۡ غَضَبٞ مِّنَ ٱللَّهِ وَلَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ﴾ [النحل: ١٠٦]

“যার ওপর জবরদস্তী করা হয়েছে এবং তার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে সে ব্যতীত যে কেউ বিশ্বাসী হওয়ার পর আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয় এবং কুফুরীর জন্য মন উম্মুক্ত করে দেয় তাদের ওপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তাদের জন্যে রয়েছে শাস্তি।” [সূরা আন-নাহাল, আয়াত: ১০৬] বাধ্য অবস্থায় কুফুরীতে লিপ্ত হওয়ার পাপ যদি ক্ষমা করা হয়, তবে তার নিম্ন পর্যায়ের পাপে বাধ্য হয়ে লিপ্ত হলে ক্ষমা হওয়াটা অধিক যুক্তিযুক্ত। তাছাড়া হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন,

«إِنَّ اللَّهَ وَضَعَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ»

“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতের ভুল ক্রমে করে ফেলা এবং আবশ্যিক বিষয় করতে ভুলে যাওয়া ও বাধ্য অবস্থায় করে ফেলা পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন।”[9]

এ ভিত্তিতে কারো নাকে যদি ধুলা ঢুকে পড়ে এবং তার স্বাদ গলায় পৌঁছে ও পেটের ভিতর প্রবেশ করে, তবে তার সাওম ভঙ্গ হবে না। কেননা সে এটার ইচ্ছা করে নি।

অনুরূপভাবে কাউকে যদি সাওম ভঙ্গ করতে জবরদস্তি করা হয় আর সে বাধ্য হয়ে সাওম ভঙ্গ করে ফেলে, তবে তার সিয়াম বিশুদ্ধ। কেননা সে অনিচ্ছাকৃতভাবে একাজ করেছে।

এমনিভাবে ঘুমন্ত ব্যক্তির স্বপ্নদোষ হলে, তার সিয়ামও বিশুদ্ধ। কেননা সে ছিল ঘুমন্ত, ইচ্ছাও ছিল না তার একাজে। কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রীকে তার সাথে সহবাস করতে বাধ্য করে এবং স্ত্রী বাধ্যগত হয়ে সহবাসে লিপ্ত হয়, তবে তার (স্ত্রীর) সিয়াম বিশুদ্ধ। কেননা একাজে তার কোনো এখতিয়ার ছিল না।

একটি মাসআলা: খুবই সতর্ক থাকা উচিৎ। কোনো মানুষ যদি রামাযানে দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হয়, তবে নিম্নলিখিত পাঁচটি বিধান তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবেঃ

১. সে গুনাহগার হবে।

২. দিনের বাকী অংশ তাকে সিয়াম অবস্থায় কাটাতে হবে।

৩. তার উক্ত সিয়াম বিনষ্ট হবে।

৪. তাকে কাযা আদায় করতে হবে।

৫. কাফ্‌ফারা আদায় করতে হবে।

সহবাসে লিপ্ত হলে কি ধরণের কাফফারা দিতে হবে এ সম্পর্কে জানা থাক বা না জানা থাক কোনো পার্থক্য নেই। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি রামাযানের দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হলো (সাওমও তার ওপর ফরয)[10] কিন্তু তার এ জ্ঞান নেই যে, একাজ করলে তাকে এত কাফফারা দিতে হবে, তবুও তার ওপর উল্লিখিত বিধানসমূহ প্রযোজ্য হবে। কেননা সে ইচ্ছাকৃতভাবে সাওম ভঙ্গ করেছে। আর ইচ্ছাকৃতভাবে সাওম ভঙ্গের কাজে লিপ্ত হলে, তার ওপর যাবতীয় বিধান প্রযোজ্য হবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। তিনি বললেন, “কিসে তোমাকে ধ্বংস করল?” সে বলল, রামাযানের সাওম রেখে আমি স্ত্রী সহবাস করে ফেলেছি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাফফারা আদায় করার আদেশ করলেন।[11] অথচ লোকটি জানতো না যে তাকে কাফফারা দিতে হবে কি হবে না।
আমরা বলেছি, তার ওপর সাওম ফরয। অর্থাৎ সে মুসাফির নয় নিজ গৃহে মুক্বীম হিসেবে অবস্থান করছে। যদি সফরে থেকে কোনো ব্যক্তি সাওম ভঙ্গ করে এবং স্ত্রী সহবাস করে তবে কাফফারা দিতে হবে না। কেননা সফর অবস্থায় সাওম রাখা ফরয নয়। সাওম ভঙ্গ করা ও রাখার ব্যাপারে সে স্বাধীন। তবে ভঙ্গ করলে পরে কাযা আদায় করতে হবে।

>
[1] ইবন মাজাহ, অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: ছিয়ামের ফযীলত।

[2] সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: যাকাত, অনুচ্ছেদ: প্রত্যেক সৎকাজকে সাদকা বলা হয় তার বর্ণনা।

[3] মযী, স্ত্রী শৃঙ্গার করার কারণে বা যে কোনোভাবে উত্তেজিত হলে লিঙ্গের আগায় যে আঠালো পানি বের হয় তাকে আরবীতে মযী বলা হয়। এতে অযু আবশ্যক হয় গোসল নয়।

[4] আবু দাঊদ, অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: ইচ্ছাকৃত বমি করা। তিরমিযী, অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করার বর্ণনা।

[5] বুখারী সনদ বিহীন মুআল্লাক বর্ণনা করেন। অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: সিয়ামদারের শিঙ্গা লাগানো ও বমি করা। তিরমিযী, অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: সিয়ামদারের শিঙ্গা লাগানো ঠিক না।

[6] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হায়েয, অনুচ্ছেদ: ঋতুবতীর সিয়াম পালন না করা; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, অনুচ্ছেদ: নেক কাজ কম হলে ঈমানও কমে যায়।

[7] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: আল্লাহর বাণী, ‘প্রত্যুষে (রাতের) কালো রেখা হতে (ফজরের) সাদা রেখা প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তোমরা খাও ও পান কর।’; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: ফজর উদিত হলেই সিয়াম শুরু হয়ে যাবে।

[8] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: ভুলক্রমে পানাহার করা; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: ভুলক্রমে পানাহার করলে সিয়াম ভঙ্গ হবে না।

[9] ইবন মাজাহ, অধ্যায়: তালাক, অনুচ্ছেদ: ভুল ক্রমে এবং বাধ্য করে তালাক।

[10] অর্থাৎ- সিয়াম ভঙ্গের বৈধ কোন কারণ তার সামনে নেই। যেমন সে সফরেও নয়, অসুস্থও নয়।

[11]সহীহ বুখারী, অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: রামাযানে দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাস করলে; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সিয়াম, অনুচ্ছেদ: সিয়ামদারের রামাযানের দিনে স্ত্রী সহবাস কঠোরভাবে হারাম।