ইমেইলে পাঠাতে নিচের ফর্মটি পূরণ করুন
security code
কিতাবুল মোকাদ্দস, ইঞ্জিল শরীফ ও ঈসায়ী ধর্ম ২. ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’ বনাম ‘তওরাত-যাবূর-ইঞ্জিল’ কিতাব ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)
২. ৮. কুরআন দিয়ে ইঞ্জিলের বিশুদ্ধতা দাবি

খৃস্টান ধর্মগুরুগণ উপরের তথ্যগুলি গোপন করে মুসলিমদেরকে ধোঁকা দিতে কুরআনের আয়াতের আংশিক বিকৃত অর্থ দিয়ে দাবি করেন যে, প্রচলিত তাওরাত-ইঞ্জিল সঠিক। এরূপ দুটি বিষয় উল্লেখ করছি।

  • আল্লাহ বলেন: “জেনে রাখ! আল্লাহ্‌র বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না; যারা ঈমান আনে ও তাক্ওয়া অবলম্বন করে। তাদের জন্য আছে সুসংবাদ দুনিয়া ও আখিরাতে, আল্লাহ্‌র বাক্যাবলির কোনো পরিবর্তন নেই; ওটাই মহাসাফল্য। (সূরা ১০-ইউনূস: ৬২-৬৪)।

এখানে আল্লাহ বলেছেন যে, আল্লাহর বন্ধুদের সুসংবাদ ও সাফল্যের বিষয়ে আল্লাহর বাক্য, বাণী বা বিধান কেউ রদ্দ বা পরিবর্তন করতে বা আল্লাহর বন্ধুদের ব্যর্থ করতে পারবে না। খৃস্টান প্রচারকগণ সকল কথা বাদ দিয়ে (লা তাবদীলা লিকালিমাতিল্লাহ) ‘আল্লাহর বাক্যবালির পরিবর্তন নেই’ কথাটি দিয়ে দাবি করেন যে, তাওরাত, ইঞ্জিল ইত্যাদি আল্লাহর কালাম, সেহেতু কেউ তা পরিবর্তন করতে পারবে না। অতএব প্রচলিত তাওরাত-ইঞ্জিল আদি ও অকৃত্রিম আল্লাহর কালাম!

পাঠক হয়ত প্রতারণা ধরতে পারছেন না। নিম্নের বিষয়গুলি লক্ষ্য করুন:

(ক) এখানে আল্লাহর কালেমা বা বাক্যের কথা বলা হয়েছে, আল্লাহর কিতাবের কথা বলা হয় নি। আল্লাহ যে কথা বলেন তা আল্লাহর বাক্য বা কালেমা। আর আল্লাহর কালামের লিখিত রূপ ‘কিতাব’। এখানে বলা হয়েছে, আল্লাহর বাক্য বা কথা পরিবর্তন হয় না; কারণ আল্লাহ ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। কিন্তু আল্লাহর কালামের লিখিত গ্রন্থ বিকৃত হয় না তা কখনোই আল্লাহ বলেন নি। বরং তিনি বারংবার বলেছেন যে, ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ আল্লাহর কালামের লিখিত রূপ পরিবর্তন করেছে, অনেক কালাম ভুলে গিয়েছে বা হারিয়ে ফেলেছে এবং অনেক জাল বই লিখে আল্লাহর নামে চালিয়েছে। (২-বাকারা ৭৯, ৪-আল ইমরান: ৭৮, ৫-মায়িদা ১৩, ১৪, ৪১)

(খ) কিতাবুল মোকাদ্দস প্রমাণ করে যে, আল্লাহ কালামের পরিবর্তন হয়, হারিয়ে যায় এবং জালিয়াতি করা হয়। বর্তমান প্রচলিত ‘কিতাবুল মোকাদ্দসের মধ্যে কয়েক ডজন আল্লাহর কিতাবের নাম আছে যেগুলির অস্তিত্ব দুনিয়াতে নেই। যেমন: (১) ‘সদাপ্রভুর যুদ্ধপুস্তক’ (গণনা পুস্তক ২১/১৪), (২) ‘যাশের পুস্তক (যিহোশূয় ১০/১৩), (৩) শলোমন রচিত ‘এক হাজার পাঁচটি গীত’, (৪) শলোমন রচিত ‘প্রাণী জগতের ইতিবৃত্ত’, (৫) শলোমন রচিত ‘তিন হাজার প্রবাদ বাক্য’ (১ রাজাবলি ৪/৩২-৩৩), (৬) শমূয়েল ভাববাদীর রাজনীতির পুস্তক (১ শময়েল ১০/২৫), (৭) শমূয়েল দর্শকের পুস্তক, (৮) নাথন ভাববাদীর পুস্তক, (৯) গাদ দর্শকের পুস্তক (১ রাজাবলি ২৯/২৩), (১০) শময়িয় ভাববাদীর পুস্তক, (১১) ইদ্দো দর্শকের পুস্তক (২ বংশাবলি ১২/১৫), (১২) অহীয় ভাববাদীর ভাববানী, (১৩) ইদ্দো দর্শকের দর্শন (২ বংশাবলি ৯/২৯), (১৪) হনানির পুত্র যেহুর পুস্তক (২ বংশাবলি ২০/৩৪), (১৫) যিশাইয় ভাববাদী রচিত উষিয় রাজার আদ্যোপান্ত ইতিহাস (২ বংশাবলি ২৬/২২), (১৬) যিশাইয় ভাববাদীর দর্শন-পুস্তক হিষ্কিয় রাজার ইতিহাস সম্বলিত (২ বংশাবলি ৩২/৩২), (১৭) যিরমিয় ভাববাদী রচিত যোশিয় রাজার বিলাপগীত (২ বংশাবলি ৩৫/ ২৫), (১৮) বংশাবলি পুস্তক (নহিমিয় ১২/২৩), (১৯) মোশির ‘নিয়মপুস্তক’ (যাত্রাপুস্তক ২৪/৭) এবং (২০) শলোমনের বৃত্তান্ত-পুস্তক (১ রাজাবলি ১১/৭)।

কিতাবুল মোকাদ্দস বলছে যে, এগুলি সবই আল্লাহর কিতাব। ইয়াহূদী-খৃস্টানগণ স্বীকার করতে বাধ্য যে, কিতাবগুলি তাদের কাছে নেই। আপনি খৃস্টান প্রচারককে বলুন: ২০টি আস্ত কিতাব যদি হারিয়ে যেতে পারে তাহলে বিদ্যমান কিতাবগুলির কয়েক হাজার আয়াত হারানো বা বিকৃত হওয়া অসম্ভব হবে কেন?

(গ) কিতাবুল মোকাদ্দস প্রমাণ করে যে আল্লাহর কিতাবের জালিয়াতি হয়। ক্যাথলিকদের কিতাবুল মোকাদ্দসে বইয়ের সংখ্যা ৭৩; কিন্তু প্রটেস্ট্যান্টদের কিতাবুল মোকাদ্দসে বইয়ের সংখ্যা ৬৬। ৭টি বই-ই বেশি কম। উভয়ের মধ্যে বিদ্যমান বইগুলির মধ্যেও আয়াত ও অধ্যায়ে অনেক বৈপরীত্য। আবার প্রটেস্ট্যান্ট বাইবেলের কিং জেমস ভার্শন ও রিভাইযবড স্টান্ডার্ড ভার্শনের মধ্যে শতশত আয়াত ও হাজার হাজার শব্দের পার্থক্য। একটি সঠিক হলে অন্যটিকে জাল। অথবা সবগুলিই জাল।

(ঘ) কিতাবুল মোকাদ্দসে বারংবার আল্লাহর কিতাবের জালিয়াতির কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, ভণ্ড নবীগণ বা ভণ্ড শিষ্যগণ আল্লাহর বা মাসীহের নামে জাল কথা প্রচার করবে (মথি ৭/১৫, ২৪/১১, ২৪/২৪, মার্ক ১৩/২২)। সাধু পল লিখেছেন: “আমার আশ্চর্য বোধ হইতেছে যে, খৃস্টের অনুগ্রহে যিনি তোমাদিগকে আহ্বান করিয়াছেন, তোমরা এত শীঘ্র তাঁহা হইতে অন্যবিধ ইঞ্জিলের (unto another gospel) দিকে ফিরিয়া যাইতেছ।” (গালাতীয় ১/৬। আরো দেখুন: ২ করিন্থীয় ১১/৪, গালাতীয় ১/৮-৯) খৃস্টান প্রচারককে বলুন, আল্লাহর নামে যদি জাল কথা বলা ও জাল ইঞ্জিল লেখা অসম্ভব হয় তাহলে ভণ্ড নবী, ভণ্ড খৃস্ট ও জাল ইঞ্জিল কিভাবে হলো?

(ঙ) খৃস্টান প্রচারককে বলুন, সত্যই তো পরিবর্তন ও বৈপরীত্য তো আল্লাহর বিশুদ্ধ কালামের মধ্যে থাকে না। তবে আল্লাহর নামে জাল করা শয়তানী কালামের মধ্যে পরিবর্তন ও স্ববিরোধিতা থাকে। প্রচলিত কিতাবুল মোকাদ্দসের মধ্যে বিদ্যমান স্ববিরোধিতাই প্রমাণ করে যে, তা আল্লাহর কালাম নয়।

  • অন্যত্র আল্লাহ বলেন: “আমি বনী ইস্রাঈলকে উৎকৃষ্ট আবাসভূমিতে বসবাস করালাম এবং আমি ওদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ দিলাম, তারপর ওদের কাছে জ্ঞান আসলে ওরা বিভেদ সৃষ্টি করল। ওরা যে বিষয়ে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল আপনার প্রতিপালক অবশ্যই তাদের মধ্যে কিয়ামতের দিনে ওটার ফয়সালা করে দেবেন। আমি আপনার প্রতি যা নাযিল করেছি তাতে যদি আপনার সন্দেহ থাকে তবে আপনার আগের কিতাব যারা পাঠ করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন; আপনার প্রতিপালকের কাছ থেকে আপনার কাছে সত্য এসেছে। আপনি কখনো সন্দেহপ্রবণদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না, এবং যারা আল্লাহ্‌র নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছে আপনি কখনো তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না, তাহলে আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।” (সূরা ১০-ইউনুস ৯৩-৯৫)

মিশনারিগণ প্রথম ও শেষ বাদ দিয়ে মাঝের অংশটুকু উল্লেখ করে বলেন, কুরআনের বিষয়ে সন্দেহ হলে বাইবেল থেকে সত্য জানতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, কিতাবুল মোকাদ্দস সত্য এবং তা পালন করা জরুরী!

সম্মানিত পাঠক, এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে আল্লাহ প্রত্যেক কুরআন পাঠকারীকে সম্বোধন করে বললেন যে, বনী ইসরাঈল বিষয়ক তথ্যগুলির বিষয়ে কারো সন্দেহ হলে পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলি থেকে যাচাই করতে পার। মহান আল্লাহ কোনো জাতিকে অনুগ্রহসিক্ত করার পরেও যদি তারা অবাধ্য হয় এবং মতভেদ ও হানাহানি করে তবে তাদের কিরূপ শাস্তি হবে তা মুসলিমদের জানা প্রয়োজন, যেন তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও নিয়ামত পাওয়ার পরে অবাধ্যতা ও হানাহানিতে লিপ্ত না হয়। আর এ বিষয়ে ‘কিতাবুল মোকাদ্দস’ একটি বিশ্বকোষ! আল্লাহ বনী ইসরাঈলকে কত প্রকারের নিয়ামত দিয়েছেন, নিয়ামত পাওয়ার পরেও কতভাবে তারা আল্লাহর কিতাবে অবিশ্বাস, কিতাব প্রত্যাখ্যান, সন্দেহ, শির্ক, কুফর, মুর্তিপূজা, পাপাচার ও হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছে এবং এর শাস্তিতে কত প্রকারের গযব আল্লাহ তাদের দিয়েছেন তা বিস্তারিত এ গ্রন্থে সংকলিত। এজন্য আল্লাহ বললেন যে, হে কুরআনের পাঠক, যদি তোমার মনে পূর্ববর্তী জাতিদের পরিণতির বিষয়ে কোনো সন্দেহ আগমন করে তবে তুমি পূর্ববর্তী কিতাবগুলি যারা পাঠ করে তাদেরকে প্রশ্ন করলেই জানবে যে, এ বিষয়ে কুরআনের তথ্য নির্ভুল।

সম্মানিত পাঠক, যে কোনো গবেষক যদি বিশ্বসৃষ্টি, পূর্ববর্তী জাতিগণের ইতিহাস ও পরিণতি সম্পর্কে কুরআন মাজীদ অধ্যয়ন করেন এবং বাইবেলের সাথে তা তুলনা করেন তবে নিশ্চিত হবেন যে, কুরআন সন্দেহাতীতভাবে আল্লাহর কিতাব। ডা. মরিস বুকাইলি (Dr. Maurice Bucaile) রচিত (The Bible, the Qur'an and the Science ) বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান’ বইটি পড়লেই তা জানা যায়।